পিরোজপুরের কঁচা নদীতে সেতু নির্মাণের কথা বেশ জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে একযুগেরও বেশি সময় ধরে। এ দাবি সময়ের বিবেচনায় যেমন যৌক্তিক, তেমনি প্রয়োজনীয়। আজ যখন পিরোজপুর থেকে নানা যাত্রীবাহী বা পণ্যবাহী যানবাহন দেশের সকল অঞ্চলে চলাচল করে তখন এ চাহিদার নৈতিক ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। যারা কঁচা সেতুর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সক্রিয় তাদের চিন্তার পেছনে শুধু আঞ্চলিক স্বার্থই বিবেচনায় আসে তা নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিকও সমানভাবে প্রবল। বরিশাল-পিরোজপুর-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়ক, পাথরঘাটা মত্স্যবন্দর, সুন্দরবন পর্যটন নিয়ে যেমন তারা ভাবেন সাথে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর-মংলা সমুদ্র বন্দর, বেনাপোল ও ভোমরা স্থল বন্দর সংযোগও তেমনি তাদের ভাবনায় আসে।
দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক অবকাঠামো বিনির্মাণ চিন্তার ইতিহাস মাত্র দু’যুগ পুরানো। নদীমাতৃক দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলা বা সাবেক মহকুমার যোগাযোগ ব্যবস্থা ২৫ বছর আগেও সম্পূর্ণ নৌ-পথ নির্ভর ছিল। সিএন্ডবি, ডিস্ট্রিক বোর্ড, ডিস্ট্রিক কাউন্সিল বা জেলা পরিষদ, থানা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের সড়কের কথা অনেকেরই জানা। পিরোজপুর-হুলারহাট কংক্রিটের রাস্তাটি ছিল তখন এ মহকুমার একমাত্র সিএন্ডবি সড়ক। সিএন্ডবি মানে পাকিস্তান আমলের সরকারি নির্মাণ কর্তৃপক্ষ, যা বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর। ডিস্ট্রিক কাউন্সিল বা ডিসি রোড নামে খ্যাত পিরোজপুর-পাড়েরহাট সংযোগকারী সাড়ে পাঁচ মাইল ইটের (হেরিংবোন) রাস্তা, চরখালী-তুষখালী-মঠবাড়িয়া-গুলিশাখালী ডিসি রোড, পিরোজপুর-নাজিরপুর-মাটিভাঙ্গা ডিসি রোড, ইন্দুরহাট-পাথালিপাড়া ডিসি রোড, ভাণ্ডারিয়া-চরখালী ডিসি রোড ইত্যাদি নামের রাস্তাগুলো ছিল ২৫ বছর আগেও মহকুমার উন্নত (!) সড়ক যোগাযোগের পরিচায়ক ।
নৌ-যোগাযোগ নির্ভর পিরোজপুরবাসী সড়ক অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে এতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। ঢাকা-বরিশাল-খুলনা যাতায়াতের জন্য মেইল স্টিমার থেকে রকেট স্টিমার, কাঠ-বডির লঞ্চ থেকে স্টিল-বডির লঞ্চ, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ‘টেডি’ লঞ্চ এ রকম যানবাহনের অগ্রগতি পিরোজপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল সুখবর। ৮০’র দশকের শেষে এ ধরনের অল্পতে তুষ্ট ‘সুখবরের’ গণ্ডি থেকে পিরোজপুরবাসী ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। এ সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তত্কালীন এরশাদ সরকারের বিদ্যুত্ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ভাণ্ডারিয়া-কাউখালীর সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।
তখন বাংলাদেশে যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে নতুন মাত্রার উন্মেষের সাথে চির অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে নবযাত্রার সূচনা হয়। তখন তিনি এই পদে তিন বছর থেকে নৌ-পথের অঞ্চল বরিশালকে সড়ক যোগাযোগ নির্ভর করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকেন। বরিশাল-ঝালকাঠি-ভাণ্ডারিয়া, বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা, বরিশাল-ভোলা, চরখালী-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা,পিরোজপুর-পাড়েরহাট সড়ক, টগরা ও চরখালী ফেরি, পিরোজপুর বাইপাস সড়ক ইত্যাদি সড়কসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক, ফেরি ও সেতু উন্নয়ন ও নির্মাণে তিনি মনোনিবেশ করেন। ঝালকাঠির কালিজিরা সেতু, বাসন্ডা সেতু, ভাণ্ডারিয়ার পোনা সেতু, নদমূলা সেতু, তুষখালী সেতুসহ দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো হাতে নেয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। বরিশালের শিকারপুর সেতু, দোয়ারিকা সেতু, দপদপিয়া সেতু ইত্যাদি নির্মাণ প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। এ ভাবে ৮০’র দশকের শেষে পিরোজপুরে সড়ক ও জনপথ এবং এলজিইবি (লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুারো) সড়ক নির্মাণ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকার বদলে যাওয়ায় ’৯০ দশকে প্রথমাংশে দক্ষিণাঞ্চলের এ রকম অনেক উদ্যোগ ব্যাহত হয়। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ঐকমত্যের মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আবার যোগাযোগ মন্ত্রী হয়ে ৬/৭ বছর আগে সূচিত পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের অসমাপ্ত সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে উন্নয়ন কার্যক্রমে দক্ষিণাঞ্চলে সরকারের অগ্রাধিকার পরিকল্পনাকে তিনি (আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) কাজে লাগান। প্রথমে তিনি ঝালকাঠি-রাজাপুর-ভাণ্ডারিয়া সড়ক, চরখালী-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা সড়ক, পিরোজপুরের বলেশ্বর ব্রিজ, পিরোজপুর-নাজিরপুর-মাটিভাঙ্গা সড়ক ও কালিগঙ্গা সেতু, নৈকাঠি-কাউখালী-আমড়াঝুড়ি-স্বরূপকাঠি সড়ক, রাজাপুর-নৈকাঠি-পিরোজপুর সড়ক, টগরা-ইন্দুরকানি-বালিপাড়া-কলারণ সড়ক, পিরোজপুর-বাগেরহাট সড়ক ও ভৈরব সেতু নির্মাণসহ ভাণ্ডারিয়া-কাঠালিয়া-আমুয়া-বামনা সড়ক, আমুয়া ফেরি ইত্যাদি নির্মাণ ও উন্নয়নে গভীর মনোনিবেশ করেন। এ সময় গাবখান সেতু, শিকারপুর ও দোয়ারিকা সেতুও নির্মিত হয় তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। ’৯৬ থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র একাগ্রতার কারণে পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধিত হয়। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুসহ ছয়টি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, রূপসা নদীতে খানজাহান আলী সেতু, পদ্মায় লালন সেতু, মোল্লাহাট সেতু, গোপালগঞ্জের হরিদাসপুর সেতু, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ শিয়ালী নদী সেতু, মাওয়া-মংলা মহাসড়ক নির্মাণসহ অসংখ্য সড়ক-মহাসড়ক-সেতু নির্মাণের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এক অভাবনীয় সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেন। দু’টি সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী পদে আট বছর এবং বিদ্যুত্ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী পদে চার বছর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যুগান্তরকারী অবদানের জন্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম রূপকারের খ্যাতি লাভ করেন। এ সময় তিনি মন্ত্রিত্ব পদে যেমন জাতীয়ভাবে সফলতার ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখান তেমনি পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক ও বিদ্যুত্ অবকাঠামো ক্ষেত্রে শতবর্ষের বৈষম্য, পশ্চাত্পদতা, উপেক্ষা, বঞ্চনা আর অবহেলার অবসান ঘটান। যা এ অঞ্চলের জনজীবনে এক বৈপ্লবিক ধারার সৃষ্টি করে। পিরোজপুর জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়করণের জন্য প্রায় একযুগ দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা মন্ত্রী ছিলেন তিনি। যার ফলে আজ সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে পিরোজপুর জেলায় বিদ্যমান সড়কের সংখ্যা ২২টি এবং দৈর্ঘ্য ৩০০ কিলোমিটার। এ বিভাগের অধীন পিরোজপুরের বলেশ্বর সেতু, জিয়ানগর সেতু, ভাণ্ডারিয়ার পোনা সেতু, শিয়ালকাঠি সেতু, ভুবনেশ্বর সেতু, গাজীপুর সেতু, কাউখালীর চিড়াপাড়া সেতু, নাজিরপুরের কালিগঙ্গা সেতু, চালিতাবাড়িয়া বেইলী সেতু, মাটিভাঙ্গা বেইলী সেতু, রঘুনাথপুর বলেশ্বর সেতু, মঠবাড়িয়ার তুষখালী বেইলী সেতু, সাফা বেইলী সেতু, গুদিঘাটা সেতু, স্বরূপকাঠি সেতু, ইন্দুরহাট সেতু, নাপিতখালী সেতু ইত্যাদি বড় ও মাঝারি সেতু নির্মিত হয়েছে গত ২৫ বছরে। এ ছাড়া এ ২২টি সড়কে আরও অসংখ্য কালভার্ট রয়েছে।
পাশাপাশি এলজিইডি’র অধীন মোট রাস্তা রয়েছে ১৩০০টি। যার দৈর্ঘ্য ৪১৯৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে উপজেলা সড়ক হচ্ছে ৬৩টি, ইউনিয়ন সড়ক ১০১টি, গ্রামীণ সড়ক ‘এ’ টাইপ ৬১৩টি ও ‘বি’ টাইপ ৫২৩টি। এর মধ্যে পাকা ৪২টি, অন্যান্য পাকা ১৩৬টি, আংশিক পাকা ৪০২টি এবং কাঁচা ৪৭টি। কাঁচা সড়কগুলোর দৈর্ঘ্য ২৭৯০ কিলোমিটার। ৫০৯ কিলোমিটার পাকা, ৮৬৩ কিলোমিটার ইটবিছানো ও ৩৩ কিলোমিটার কংক্রিট নির্মিত। ৪১৬৫টি ছোট-বড় কালভার্ট, বক্স কালভার্ট, ব্রিজ রয়েছে এলজিইডি’র গ্রামীণ সড়কগুলোতে। সেখানেও রয়েছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র অবদান। জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক, উপজেলা সংযোগ সড়ক নির্মাণে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর দেশব্যাপী যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষেত্রে যেমন বিরাট সাফল্যের উদাহরণ স্থাপন করেছে তেমনি এলজিইডি’র কার্যক্রমও প্রণিধানযোগ্য। এ সময় থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট— এলজিইডি আমাদের দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের যে ধারা সৃষ্টি করেছে তার দেখা মেলে পল্লীবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ার নিভৃত জনপদ তেলিখালী ইউনিয়ন এক্ষেত্রে একটি মডেল। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এ গ্রামীণ জনজীবনকে সভ্যতার সকল সুফল থেকে বঞ্চিত রেখেছিল অনাদিকাল ধরে। সড়ক, ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম, সাইক্লোন সেল্টার, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবনসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আজন্ম অবহেলিত এ অজপাড়াগাঁ আজ উন্নত গ্রামীণ জনপদের উদীয়মান ধারার নয়া সড়কে ধাবমান। যেখানে আধুনিক বাংলার অন্যতম রূপকার ভাণ্ডারিয়া তথা পিরোজপুরের সন্তান, দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন বঞ্চিত মানুষের ভাগ্যপরিবর্তনের সারথী সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র একাগ্রতায় ২৫ বছর ধরে নিবিষ্ট রয়েছে। আর সাথে রয়েছে তাঁর সহধর্মিণী ’৯৬ সালে নির্বাচিত এলাকার সংসদ সদস্য বেগম তাসমিমা হোসেনের গভীর মমতায় সূচিত গ্রামীণ নারী-পুরুষের জন্য ভালোবাসা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা তথা অনুপ্রেরণা। গণমানুষের জন্য তাঁদের এই সহজাত কল্যাণ আকাঙ্ক্ষাকে পাথেয় করে আমরা এলাকার উন্নয়নকামী গুটি কয়েক তরুণ-যুবা উদ্যোগী মানুষ পল্লীবাসীর দিনবদলের সংগ্রামের সাথী আজও। আমাদের এ প্রচেষ্টা নিরন্তর থাকবে আজীবনকাল।
লেখক ঃ সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব
