পড়ালেখা শেখার আগেই আমার হাতে খেলনার বদলে শিশুতোষ বই তুলে দিয়েছিলেন আমার আব্বা। আর আমিও সেগুলো বুকে চেপে সারাবাড়ি ঘুরে বেড়াতাম।
আমাদের বাড়ির সবক’টা ঘরই ছিল বই আর পত্র-পত্রিকায় ঠাসা।
যাতদূর মনে পড়ে বাঁধাই করা সওগাত, মাহেনও, বেগম, সন্ধানী, কবরী, আলাপনী, টাপুরটুপুর, কচি ও কাঁচা, রঙধনু এগুলো ছিল অন্যতম। এছাড়াও দেশ-বিদেশের সব ভালো ভালো পত্রিকা আসত আব্বার নামে। দেশের সবক’টি দৈনিক, মাসিক, পাক্ষিকসহ বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন পড়ার সৌভাগ্য ছিল আমাদের।
আমার আব্বা মরহুম মুহম্মদ নূরুল হক নিজে একাধারে ছিলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ও মাসিক আল ইসলাহ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি আল ইসলাহ প্রকাশ ও সম্পাদনা করে গেছেন। সিলেট তথা দেশের প্রথিতযশা লেখকরা আল ইসলাহতে লিখতেন। সম্পাদক ও কর্মাধ্যক্ষের পাশাপাশি আব্বা নিজেও ছিলেন একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক, সুলেখক, সুবক্তা। সমাজে তিনি ছিলেন অসম্ভব সম্মানিত ও গুণী ব্যক্তিত্ব। আমরা শিশুকাল থেকেই আব্বার ব্যস্ত জীবন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ অতিথি বা সভাপতির আসনে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমরা ভাই-বোনেরা সেসব অনুষ্ঠানের অনুকরণে বাড়িতে সভাপতি সভাপতি খেলায় মেতে উঠতাম। বিশেষ করে শীতকালে বিছানার উপর ভাঁজ করে রাখা লেপ-কম্বল হতো সভাপতির বসার আসন। সম্প্রতি সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যাপক সাহেদা বেগম আব্বার উপর তাঁর পি.এইচডি সম্পন্ন করে ডিগ্রি লাভ করেছেন।
পাকিস্তান সরকার আব্বাকে ‘তমঘা-ই-খেদমত’ নামে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আব্বা সে খেতাব বর্জন করেন। বাংলা একাডেমীর ফেলোশিপ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য সম্মানে আব্বাকে মূল্যায়িত করা হয়।
পড়ার জগতের বিশাল পৃথিবীর দ্বার তিনি আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আব্বার কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের শিশু সাহিত্যের আলমারির সব বই আমরা ভাই-বোনেরা প্রতিযোগিতা করে পড়তাম। ছোটবেলা থেকেই আমরা শিক্ষিত সুধীজনদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠি। আমাদের বাসায় লেখক-সাংবাদিকদের ছিল অবাধ যাতায়াত।
আমার আম্মা বেগম নূরুন্নেসা হকের ঘর-সংসারের পাশাপাশি লেখালেখি ছিল নেশা। দেশের জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন সংকলনে তাঁর প্রচুর গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়াগান প্রকাশিত হয়। তিনি সংকলন ও সম্পাদনা করেছিলেন। আমার শিক্ষয়িত্রী আম্মা বাংলা, ইংরেজি, আরবী, সিলেটের নাগরীতে পারদর্শী ছিলেন। আমার নানাও ছিলেন শিক্ষক। অসম্ভব জ্ঞানী আমার নানা টাইটেল পাস করেও আমার আম্মার সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়েছিলেন। আমার মতোই ভাষার দখল তো ছিলই, তার সাথে ফার্সী ভাষাতে তাঁর প্রচুর কবিতা ছিল, যা তিনি সংগোপনে খাতায় লিখে রেখেছিলেন। অসম্ভব রক্ষণশীল আমার নানা আম্মার উচ্চ শিক্ষায় কখনো বাধা দেননি। আর আম্মার কবিতা লেখার যোগ্যতা নানার কাছ থেকেই জন্মগতভাবে পাওয়া ছিল।
আমার মেজো মামা যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন আমরা তখন অনেক ছোট। তাঁর সাথে আমাদের পত্রালাপ হতো কবিতার মাধ্যমে।
আব্বার আল ইসলাহতে কিশোর মজলিশ নামে একটি কিশোর বিভাগ ছিল। পরিচালক ছিলেন অলিভাই। অলিভাইয়ের অন্তরালের মানুষ ছিলেন মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ। তিনি ছিলেন আমাদের চাচাতো ভাই। পিতৃ-মাতৃহীন এই ভাই আমাদের পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার অসংখ্য ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।
কিশোর মজলিশের জন্য সারাদেশ থেকে অসংখ্য লেখা আসত। সেগুলো বাছাই করে বিশেষ করে ছড়া-কবিতা ঠিকঠাক করে আমার আম্মা সেগুলোকে প্রকাশ উপযোগী করে তুলতেন। এছাড়া ও ধাঁধার আসর ছিল। আমরা ভাই-বোনেরা ধাঁধার জবাব খুঁজতাম হই-হল্লা করে।
আমার বড় বোনেরা ততদিনে টুকটাক লেখা শুরু করে দিয়েছেন। আমার বয়স তখন সাত কি আট।
আব্বা প্রতিষ্ঠানের কাজ সেরে প্রচুর পড়াশোনা ও লেখালেখি শেষ করে অনেক রাতে বাসায় ফিরতেন। প্রায় রাতেই ঘুম ভাংলেই আমি দেখতাম নিঝুম বাড়িতে আমার আম্মা হয় কিছু লিখছেন, না হয় বই পড়ায় মগ্ন হয়ে আছেন। কেন যেন এ দৃশ্য দেখলে আমার মন কেমন করে উঠতো। আমিও আম্মার পাশে যে কোন গল্পের বই নিয়ে পড়তে থাকতাম।
দেব সাহিত্য কুটিরের বই তখন নিয়মিত পাওয়া যেত এবং আমাদের খুব প্রিয় ছিল। আব্বা-আম্মা দু’জনেরই পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল। আম্মা দু’দিন পরপরই পানের বাটায় সাদা কাগজ চারপাশে নকশি কেটে বিছিয়ে দিতেন। কতদিন এমন হয়েছে হঠাত্ ঘুম ভেঙ্গে ছড়া বা কবিতা লেখার কাগজ হাতের কাছে না পেয়ে সে পান বাটার কাগজে তাঁর কবিতা বা ছড়া লিখে ফেলতেন। সকালে সেগুলো আবার খাতায় তুলে নিতেন।
এমন যার বাড়ির পরিবেশ, লেখালেখিতে আসা তার জন্য ছিল খুবই স্বাভাবিক। সুতরাং আমিও চলে এলাম। খুব কম বয়সে। সাত কিংবা আট। এক রাতে লিখে ফেললাম ছোট্ট একটা ছড়া। খুকুমণি নাচছে/নূপুর তার বাজছে/নাম দেখে টিয়ে পাখি/মুখ টিপে হাসছে।
আম্মাকে দেখাতেই সেটা কপি করতে বললেন। করলাম। বললেন লিখ। মিতাভাই আমার লেখাটা ঠিকঠাক করে ছেপে দেবেন। জীবনের প্রথম চিঠি লেখা শেখালেন আম্মা। তারপর খাম এনে ঠিকানা লিখতে শেখালেন।
দৈনিক পয়গামের নওনেহালের আসরের পরিচালক মিতাভাই বরাবরে আমার এই ছড়া ও পত্র প্রেরণ। পরের সপ্তাহেই আমার ছড়াটি ছাপা হয়ে গেল কোনরকম ঠিকঠাক ছাড়াই। সেই শুরু। আমাকে লেখার নেশায় পেয়ে বসলো। গল্প, কবিতা, ছড়া সব লিখতে শুরু করলাম। সব দৈনিকের, সাপ্তাহিকের শিশু-কিশোর পাতায় তা ছাপা হতে থাকে আর আমারও উত্সাহ বাড়তে থাকে।
আমার আম্মার ছড়া-কবিতার উপর দখল ছিল খুব ভালো। আম্মার কাছেই ছন্দ, মাত্রা এসব শিখে নিলাম।
ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর, দৈনিক বাংলার সাত ভাই চম্পা, দৈনিক জনপদের কিশোর জনপদ, বাংলার বাণীর শাপলা কুঁড়ির আসর, জনকণ্ঠের কচিকণ্ঠ, দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল, পূর্বদেশের চাঁদেরহাট, বাংলা একাডেমীর ধান
শালিকের দেশ, শাপলা-শালুক, শিশু-কিশোর বাংলা এগুলোসহ বিভিন্ন সাময়িকী ও সংকলনের নিয়মিত লেখক হয়ে উঠলাম। দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান, এখলাসউদ্দিন ভাই, আফলাতুন ভাই, দাদুভাই রফিকুল হক, কবি হাবিবুর রহমান বিশেষ করে সাত ভাই চম্পা ও কচি-কাঁচার আসরে নামি-দামি শিল্পীদের দিয়ে আমার বহু লেখার সাথে ইলাস্ট্রেসন দিয়ে সেগুলো আকর্ষণীয় করে ছাপতেন।
একাধারে গল্প, কবিতা, ছড়া লেখার কারণে সারাদেশের প্রায় সবক’টি জেলার কোন না কোন লেখক তাদের প্রকাশিত সংকলন বা পত্রিকার জন্য আমার কাছ থেকে লেখা চেয়ে নিতেন। আমরা ভাই-বোনেরা নতুন কিছু লিখলেই একজন আরেকজনকে পড়ে শোনাতাম। মতামত নিতাম। বিশেষ করে আম্মা আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন।
খামে টিকেট লাগানো থেকে শুরু করে প্রকাশিত লেখার কাটিংস সংগ্রহে রাখা সবই আব্বা-আম্মা হাতে-কলমে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বালিকা বয়সে লেখালেখিতে প্রবেশের কারণে দৌড়ঝাঁপ করে পোস্ট অফিসে যাওয়া, পত্রিকা কেনা এসব বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে করতাম। আমার বন্ধুরা আমার লেখা ছাপা হলেই সে পত্রিকা কিনে নিত। সেরা স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। স্কুলের প্রথম দেয়াল পত্রিকা প্রকাশসহ সাহিত্যধর্মী সব অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকত। টিচাররা খুব উত্সাহ দিতেন। স্নেহ করতেন। এই প্রচেষ্টা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও অব্যাহত ছিল। আম্মা আমাদের লেখালেখির পাশাপাশি বিতর্ক উপস্থাপনা এসবেও জড়িয়ে রাখতেন। সিলেট বেতারের সাথে আব্বা-আম্মা ও আমরা কয়েক ভাই-বোনই নিয়মিত জড়িত ছিলাম। আমার লেখা গান, কথিকা, নকশা, পরিচালনা, কবিতা পাঠ এগুলো প্রচারিত হতো।
আমরা ভাই-বোনেরা মিলে পত্রিকা সংকলন সম্পাদনা করেছি। লেখক বন্ধুদের সাথে মিলে ছড়াকার্ড, সংকলন প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছি। সিলেটে হাতেগোনা কয়েকজন লেখকের মধ্যে আমরা ভাই-বোনেরা নিয়মিত সাহিত্যসভা ছড়া পাঠের ও কবিতা পাঠের আসরে অংশ নিতাম। স্থানীয় দু’টি সাপ্তাহিকের ফিচার বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছি বেশ কিছুদিন। শীতলপাটি গরম চা নামে একটি ছড়া সংকলন সম্পাদনা করেছি, যার সব কিছুই ছিল ছন্দবদ্ধ। সব ক’টা বিজ্ঞাপন, সম্পাদকীয় সবই ছড়ার ছন্দে আমি লিখে দিয়েছিলাম। এরকম সংকলন সিলেটে প্রথম ও একমাত্র সংকলন ছিল।
আমাদের পরিবারে যে কোন বিয়ের উপলক্ষে উপহার নামে এক পাতার শুভেচ্ছাপত্র প্রকাশসহ চমত্কার সাহিত্য সংকলন প্রকাশিত হয়। আমার চাচাত ভাই আব্দুল হামিদের বিয়েতে মরহুম ফরহাদ খানের সম্পাদনায় ‘বন্ধন’ নামে চমত্কার একটি সংকলন বহুকাল আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে নারাঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা নামে পারিবারিক বিয়ে সংকলন প্রকাশ অব্যাহত আছে।
ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে উত্তাল দেশে সে সময় গণজাগরণের যে সাহিত্য রচিত হয় সেখানে বিভিন্ন প্রকাশনায় আমরা ভাই-বোনেরা লিখেছিলাম। স্বাধীনতা-উত্তর শিশু-কিশোর পাতায় স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত প্রচুর ছড়া, কবিতা, গল্পও প্রকাশিত হয়।
খুব ছোটবেলা থেকে লেখালেখির কারণে আমার প্রকাশিত লেখার সংখ্যার তুলনায় আমার বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। এ পর্যন্ত আমার ছোটদের জন্য প্রকাশিত বইগুলো হলো- রাজপথের রাজা, আজ তোমাদের ছুটি, কামিনীফুল কিশোরবেলা, পায়রা যদি টায়রা পরে।
রাজপথের রাজার প্রথম মুদ্রণ ও দ্বিতীয় মুদ্রণের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা করেন শিল্পী হাশেম খান। বড়দের জন্য লেখালেখি করলেও মূলত আমার লেখার ক্ষেত্র হচ্ছে শিশু-কিশোর সাহিত্য। আমি আমার দেশ ও দেশের মানুষকে সবচেয়ে আপন ভাবি এবং এই ভাবনা থেকেই আমার হূদয় থেকে উত্সারিত হয় আমার লেখা কাব্য বা গদ্য। লেখালেখিতে ছিলাম এবং থাকতে চাই আমরণ।
আমার আব্বার সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং সৃজনশীল জগতে বেড়ে ওঠা আমারও স্বপ্ন ছিল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করবো। সেজন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্স ও এম এ ডিগ্রি নিয়েছিলাম। কিন্তু অতঃপর বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ১৯৮৮ ইংরেজিতে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে অদ্যাবধি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। সে আরেক গল্প। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিশুপাতা আরো আকর্ষণীয়, আরো সমৃদ্ধ হোক, শিশু-কিশোরদের জন্য কর্তৃপক্ষ অন্তত দু’টি পাতা বরাদ্দ রাখবেন এই প্রত্যাশা পূর্ণ হোক এই কামনাই করি।
