আমাদের এদেশ বৈচিত্র্যে ভরা। এ ভরা বর্ষা মৌসুমে কোথাও সূর্যের তাপ প্রখর-গরমও প্রচণ্ড। কোথাও পানীয়জলের সংকট, নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে আবার কোথাও প্রচুর বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে ক্ষেত, খামার, বাড়িঘর, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ইত্যাদি। দেশে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন বেশ ভাল করে অনুভব করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ দেশের বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে যাওয়া। নির্বিচারে বন উজাড় ও জনসংখ্যার চাপে দিনে দিনে তা আরো হ্রাস পাচ্ছে। প্রতি বছরই কারণে-অকারণে প্রচুর গাছ কাটা হয়, রোপণ করা হয়, তাও আবার পরিচর্যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
বন বিভাগের ফাইলপত্র ও অন্যান্য সূত্র হতে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, দেশের যে সমস্ত এলাকায় কিছু বনাঞ্চল ছিল তা নির্বিচারে কেটে শুধু উজাড়ই করা হচ্ছে না— নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের মূল্যবান বৃক্ষাদি কেটে বনভূমি উজাড়ের খবর দেশের সকল মহলের জানা। এ কাজে বন বিভাগের ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা রক্ষকের বিনিময়ে ভক্ষকের। তার সঙ্গে রয়েছে অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী।
প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় বনাঞ্চলের বিকল্প নেই। একথা আজ বিশ্বের সব মানুষ অনুধাবন করতে শুরু করেছে। তাই লাখ লাখ ডলার খরচ করে মধ্যপ্রাচ্যের বালুর পাহাড়ে বৃক্ষচারা রোপণ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ করে বনাঞ্চল সৃষ্টি করা হচ্ছে। মরুময় এসব দেশে গাছপালার বদৌলতে বৃষ্টিপাত হতে শুরু হয়েছে। নিত্যদিনের ব্যবহার্য শাক-সবজি আজ তারা নিজেরাই উত্পন্ন করছে। কোন কোন দেশ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে রফতানীও করছে।
সরকার বনভূমি হতে প্রতি বছর বেশ মোটা অংকের রাজস্ব আয় করে থাকেন। এ আয় থেকে অন্তত চার ভাগের এক ভাগও যদি আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বনাঞ্চল সৃষ্টিতে ব্যয় করতেন তাহলে সবুজ, সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা দেশটির এ জীর্ণশীর্ণ অবস্থা হতো না।
আমাদের দেশে বিভাগওয়ারী হিসেবে বর্তমান পর্যায়ে যে পরিমাণ ভূমি আছে তা হতাশাব্যঞ্জক। সরকারি হিসেবে মোট আয়তনের তুলনায় বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগে ০.৪১ শতাংশ তার বিপরীতে জনসংখ্যা ২৪ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ৩.৪০ শতাংশ তার বিপরীতে লোকসংখ্যা ৩০ শতাংশ, খুলনা বিভাগে (বরিশালসহ) ১৮.২৪ শতাংশ তার বিপরীতে লোকসংখ্যা ২০ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৬.৪১ শতাংশ তার বিপরীতে লোকসংখ্যা ২৬ শতাংশ।
এদিকে বনাঞ্চল বা বনভূমি দিনে দিনে উজাড় হচ্ছে। ফলে বিপদের আশংকা বাড়ছে। কালবৈশাখী, ঝড়, সাইক্লোন, অকাল বন্যার তাণ্ডব দেখা দিচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে রক্ষার একমাত্র উপায় দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনাঞ্চল সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখা। এদিকে নজর না দিলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে উঠার পূর্বে আমাদের সচেতনতার সাথে যেখানে সম্ভব বৃক্ষরোপণ করে রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় আমাদের মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক
