আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের শেষ বাজেট, নির্বাচনী বছরের বাজেট এবং নতুন সরকারের বাজেট। তাই এই বাজেটটি বাস্তবায়িত হবে তিনটি শাসনামলে। সেদিক থেকে এই বাজেটের বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। বাস্তবায়নের আগে অবশ্য দেখা প্রয়োজন কিরকম বৈশ্বিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে সামনের বাজেটটি প্রণীত হতে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দাভাব কাটার কোন লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তাই এই সংকটের প্রভাব আমাদের ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আমাদের রফতানি বৃদ্ধির হার অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-এপ্রিল ২০১৩ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে রফতানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০১২ অর্থবছরের একই সময়ের চাইতে ১০.১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২০১২ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ের চাইতে ২০১৩ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে ১৫.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সাফল্যের বিপরীতে যদি অন্যান্য সূচকগুলো দেখি তাহলে আমরা দেখবো বেশকিছু জায়গায় অগ্রগতি এখনো আশানুরূপ হয়নি।
মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির ক্ষেত্রে ২০১৩ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বর্তমান অর্থবছরের নয় মাসের উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাথমিক হিসাব করে বলছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হতে পারে। উল্লেখ্য, অর্থবছর ২০১২ সালেও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। অন্যদিকে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ জিডিপির ১৯ শতাংশ হবে বলেও পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। চলতি ২০১৩ অর্থবছরে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল জিডিপির ২০ শতাংশ। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের শ্লথ গতি বোঝা যায় পুঁজি পণ্য আমদানির জন্য আমদানি ব্যয় হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত এটির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল (-)১০.৬ শতাংশ। তবে সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০০৯ অর্থবছর থেকেই ভাল অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগ ৭.৯ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অর্জন ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০১৩ অর্থবছরের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তার চাইতে ১ শতাংশ বেশি এবং গত ২০১২ অর্থবছরের চাইতে ৩৬.০০ শতাংশ বেশি। সরকারি বিনিয়োগ কোন একক অর্থবছরে এই হারে কখনো বৃদ্ধি পায়নি। আর জিডিপির অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগ ২০১২ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৩ অর্থবছরে ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে এই হিসাবটি প্রাথমিক এবং এটি করা হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হবে সেটি ধরে। কিন্তু পরবর্তীতে এডিপির আকার ছোট করা হয়েছে। তার ফলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার হারে একটু পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। এর অর্থ হচ্ছে চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন ভাল হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৯.৫ শতাংশ, যেটি গত অর্থবছরে একই সময়ের চাইতে বেশি। তবে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এবছর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮.৫ শতাংশ। জুলাই ২০১২ থেকে এপ্রিল ২০১৩ পর্যন্ত সময়ে এক্ষেত্রে বৃদ্ধি হয়েছে ১৬.১ শতাংশ অর্থাত্ মে এবং জুন এই দুই মাসে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে হবে ২৭.৪ শতাংশ হারে। দেখা যাচ্ছে, আয়কর এবং মূল্য সংযোজন কর আদায়ের হার উল্লিখিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার বেশি হলেও আমদানি শুল্ক এবং প্রতিস্থাপক শুল্ক আহরণ অনেক পিছিয়ে আছে। চলতি অর্থবছরের ঘাটতি বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অনুন্নয়ন খাতে রাজস্ব ব্যয় বাজেটের হিসাব অনুযায়ী হয়েছে। নীট রাজস্ব ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১২.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত সময়ে এটি হয়েছে ১২.৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ব্যত্যয় ঘটেছে সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে, যেটি ১৫.৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থবছর যখন শেষের দিকে এগুচ্ছে ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে ব্যয়ের চাপ নিম্নমুখী রাখা কষ্টসাধ্য হবে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তে হবে। এ জন্য জাতীয় সঞ্চয়ের মাধ্যমে ঘাটতি বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।
লেনদেন ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা এখন বেশ ভাল অবস্থায় রয়েছি। এক্ষেত্রে ২০১৩ অর্থবছরের প্রথম নয়মাসে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরে একই সময়ে যেখানে ৪১৯ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল চলতি অর্থবছরে জুলাই-মার্চ পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯৪৮ মিলিয়ন ডলারে। এই উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়েছে কম বাণিজ্য ঘাটতি এবং অধিক পরিমাণে রেমিটেন্স প্রবাহের কারণে। আর রফতানি প্রবৃদ্ধি ভাল হওয়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি অনেক কমেছে। অন্যদিকে প্রকল্প সাহায্য ব্যবহারের উন্নতির কারণেও অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে নীট বৈদেশিক সাহায্য অধিক পরিমাণে এসেছে।
আসন্ন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা হচ্ছে। আর্থিক কাঠামো এবং বাজেটের বাস্তবায়ন দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিভাত হচ্ছে। যে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০১৪ অর্থবছরের যে বাজেটটি প্রণীত হতে যাচ্ছে সেটির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে থাকতে হবে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ভর্তুকির পরিমাণ কমানো এবং বাজেট ঘাটতি কম রাখা। তবে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা যাই থাকুক সুচারুভাবে বাস্তবায়নই বড় কথা। কার্যকর বাস্তবায়ন না হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে দারিদ্র্য বান্ধব প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করা যায় না। তাই আগামী বাজেটের বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থের সদ্ব্যবহার প্রয়োজন। তাছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা ধরে রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য বর্ধিত বরাদ্দ ও তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা ও অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। যে বিষয়টি আসন্ন বাজেটের ক্ষেত্রে দেখার বিষয় তা হলো, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলো কতখানি গত চারটি বাজেটের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। তাও দেখার বিষয় রয়েছে। তাই এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে যেয়ে শুধুমাত্র আগামী বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, সরকারকে তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শন এবং নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব ও উন্নয়ন পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার এবং দিন বদলের সনদে জনগণের জীবনে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে কতগুলো মাইলফলক ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে ছিল ২০১৩ সালে জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ১০ শতাংশে উন্নীত করা, ২০১২ সালের মধ্যে খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন, ২০২১ সালে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদানের হার ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, ২০১৩ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রীডে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ, ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ২০১৪ সাল নাগাদ প্রত্যেক পরিবার থেকে অন্তত একজনের কর্মসংস্থান, ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য আবাসন ইত্যাদি। এই মাইলফলকগুলো অর্জন করার একটি হাতিয়ার হচ্ছে বাত্সরিক বাজেট। আগামী অর্থবছরের বাজেট কিভাবে অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো প্রতিপালন করবে সেটিই দেখার বিষয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)
