পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে বিশাল অংকের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল চারটায় জাতীয় সংসদে ৪৩তম বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন তিনি। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত বাজেট হবে কার্যত: কর আদায়ের খড়গ। একই সঙ্গে বিশাল ব্যয়ের লক্ষ্যও স্থির করা হয়েছে। অনুন্নয়ন খাতে এত ব্যয় বরাদ্দ করতে গিয়ে উন্নয়ন বরাদ্দের হার কমে গেছে। যদিও পরিমাণের দিক থেকে আগের বছরের তুলনায় উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গতানুগতিক বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের টার্গেট বেড়ে যাওয়ায় আয়ের টার্গেটও বাড়াতে হয়েছে। তা করতে গিয়ে বিভিন্ন খাতে সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হবে নতুন বাজেটে। যা জনগণের জন্য বাড়তি চাপ বয়ে আনবে বলে বিশেষজ্ঞরাও মন্তব্য করেছেন। ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শুরুতেই সংশয় দেখা দেয়ায় বছর শেষে বাজেট ঘাটতি আরো বেড়ে যাবে। অর্থসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে দেয়া এই বাজেট হবে অর্থমন্ত্রী হিসাবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের সপ্তম বাজেট। বর্তমান মেয়াদে মহাজোট সরকারের শেষ বাজেটও এটি। নির্বাচনের বছরে এই বাজেটে ব্যক্তি আয়করে ছাড়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি, শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে প্রণোদনা এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কর মওকুফ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি শিল্পায়নে কর অবকাশ সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। আবাসন ও শেয়ারবাজারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগসহ বিভিন্ন খাতে কর ছাড় অব্যাহত রাখা হবে।
এদিকে চলতি বাজেট থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে সংশোধিত বাজেট আসছে। এরমধ্যে আগামী অর্থবছরেও নেয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের বাজেট। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার হওয়ার কথা ২ লাখ ২১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। তবে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন বাজেটের আকার হবে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ৩০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা বেশি।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা : জানা গেছে, সরকার আগামী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আদায় করবে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এদিকে খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। একই অনুরোধ ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও। বিভিন্ন সময় এনবিআর চেয়ারম্যান প্রকাশ্যেই নিজের অপারগতার কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা হবে অবাস্তব। অর্থনীতিবিদরাও বলেছেন, এমন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে তা অর্জন প্রায় অসম্ভব। এই লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ বা ২৬ হাজারের মধ্যে রাখা হলে এটি অর্জনযোগ্য ছিল বলে মত তাদের। জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ আয়ের অন্যতম উত্স আয়কর খাতে ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এডিপি ও নন এডিপি ব্যয়: নতুন বাজেটে এডিপির (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। আর অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হতে পারে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে তা ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হচ্ছে ৭ শতাংশ। ঘাটতি প্রাক্কলন করা হচ্ছে ৫৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। যা মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ ধরা হচ্ছে ৩৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
ভর্তুকি: অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কৃষিপণ্যের উত্পাদন নিশ্চিত করতে একক খাত হিসেবে এবারও এ খাতে সর্বোচ্চ ভর্তুকি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে ভর্তুকি বাবদ মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ২৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে বকেয়াসহ ৯ হাজার, বিদ্যুত্ খাতে সাড়ে ৫ হাজার, জ্বালানি খাতে ৭ হাজার ৯৫০, খাদ্য খাতে ১ হাজার ৭৫৯, রফতানি খাতে ২ হাজার ৭৫০ ও অন্যান্য খাতে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। এদিকে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট থেকে ২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হতে পারে।
