জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে একাত্তরে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। গতকাল বুধবার মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি খণ্ডন শেষে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এ সময় মুজাহিদ কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ ও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চতুর্থ মামলা হিসেবে মুজাহিদের মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রইল।
গতকাল রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ আসামিপক্ষের দেয়া যুক্তি খণ্ডন শেষ করেন। তিনি বলেন, একাত্তরে আল-বদর বাহিনীকে জল্লাদের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন মুজাহিদ। সারাদেশে শান্তিকামীদের উপর সংগঠিত নৃশংসতাকে সমর্থন করেছিলেন তিনি। একাত্তরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অপরাধের সঙ্গে মুজাহিদ সম্পৃক্ত ছিলেন। অপরাধকারীদের সঙ্গে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশায় ছিলেন। তিনি ঢাকার শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ফরিদপুর স্টেডিয়ামে ছিলেন, পাকিস্তান আর্মির টর্চার সেলে ছিলেন। আমরা সাক্ষ্য ও তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি, একাত্তরে সংগঠিত অপরাধের অনিবার্য অংশ ছিলেন তিনি। তিনি তার বাহিনীর প্রতি অক্সিজেনের মতো ভূমিকা রেখেছেন। তাকে ছাড়া নৃশংস অপরাধ হতে পারতো না।
রাষ্ট্রপক্ষের অপর কৌঁসুলি মোখলেসুর রহমান বাদল ট্রাইব্যুনালে বলেন, একাত্তর সালে মুজাহিদ ছাত্র নেতা হিসেবে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিলেন। মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের সবগুলো সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুন্সি আহসান কবির সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা ১৪ মাস তদন্ত করার পর আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে বলেছেন, রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর সঙ্গে মুজাহিদের সম্পর্কের বিষয়ে তদন্তকালে কিছু পাননি। এমনকি কোনো তালিকায়ও মুজাহিদের নাম নেই। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, তিনি কোনো বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য ও দালিলিক কোনো কিছু দিয়ে মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মুজাহিদ আল বদর কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু কোনো কিছু দিয়ে তারা প্রমাণ করতে পারেনি যে, মুজাহিদ কোথাও গিয়েছেন, পরিকল্পনা করেছেন ও অপরাধে অংশ নিয়েছেন। আমরা আশাবাদী মামলার গুণগত দিক বিচার করে আদালত মুজাহিদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেবেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার আইনজীবীর মাধ্যমে মুজাহিদ ট্রাইব্যুনালে বলেন, দেশ এবং দেশের সংবিধানের প্রতি সব সময়ই আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। রাজনৈতিক কারণেই আজ আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা দেয়া হয়েছে। আমি আজ এই ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়িয়ে একটি কথাই বলতে চাই, আমি ন্যায় বিচার প্রত্যাশী। আমি আপনাদের কাছে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার চাই।
উভয় পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ৭ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত মোট চার দিবসে মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আসামিপক্ষে সৈয়দ মিজানুর রহমান ও মুন্সি আহসান কবির যুক্তি উপস্থাপন করেন। গত ২ জুন থেকে ৪ জুন পর্যন্ত আইনি বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও তার ছেলে ব্যারিস্টার এমরান সিদ্দিকী। গতকাল সকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ যুক্তি খণ্ডন করেন। যুক্তি উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। এ মামলাগুলোর সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই অন্যান্য মামলার মতো এ মামলারও রায় ঘোষণার জন্য নির্দিষ্ট দিন ধার্য করা হচ্ছে না। যেকোন দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মুজাহিদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ট্রাইব্যুনাল তা ফেরত দিয়ে অভিযোগগুলো সুবিন্যস্ত করে পুনরায় দাখিল করতে বললে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২৬ জানুয়ারি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ঐ বছরের ২৫ এপ্রিল এই মামলা ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। এই ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়।
গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। গণহত্যা, অপহরণ করে বন্দী, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনায় এসব অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, দৈনিক ইত্তেফাকের তত্কালীন নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর রাত তিনটার দিকে মুখঢাকা সাত-আটজন যুবক চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফেরেননি, তাঁর মরদেহও পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি মুজাহিদসহ কয়েকজন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনা ফরিদপুরের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন হিন্দু নিহত হন। তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তৃতীয় অভিযোগ হলো ১৯৭১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিত্ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাকে হত্যার উদ্দেশে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে আটকে নির্যাতন করে। রাতে রণজিত্ পালাতে সক্ষম হন। চতুর্থ অভিযোগ, ২৬ জুলাই সকালে গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর গ্রামের জনৈক মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাজাকাররা অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মুজাহিদ সেখানে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বললে ইউসুফের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু হয়। তিনি সেখানে এক মাস তিন দিন আটক থেকে নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তাকে যশোর সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট রাত আটটার দিকে মতিউর রহমান নিজামীকে সঙ্গে নিয়ে মুজাহিদ নাখালপাড়ার পুরাতন এমপি হোস্টেলে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যান। সেখানে আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদকে দেখে তারা গালিগালাজ করেন। মুজাহিদ একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে এদের মেরে ফেলতে হবে। পরে তাদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন। তাদের কারো মরদেহও পাওয়া যায়নি। ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে শারীরিক শিক্ষা কলেজ) পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে মুজাহিদ দলীয় নেতাদের নিয়ে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করতেন। ওই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ মে বেলা দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে রাজাকার কালু বিহারি, ওহাব, জালাল ও অন্যদের সঙ্গে মুজাহিদ গাড়ি (জিপ) করে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার খলিলপুর বাজারে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে যান। সেখানে সভার পর মুজাহিদ সঙ্গীদের নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। মুজাহিদের নির্দেশে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার হন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় ২০১১ সালের ২১ জুলাই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা। এরপর ২ আগস্ট তাকে ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। মুজাহিদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকসহ মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। অপরদিকে মুজাহিদের পক্ষে প্রথম এবং একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তার ছোট ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। গত ২২ এপ্রিল প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে আসামিপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৫ মে দিন ধার্য করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
