চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অপপ্রয়োগ বাড়ছে

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৩, ২২:৩৯
চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপব্যবহার বাড়ছে। মূলত প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতেই আদালতে এসব মামলা দায়ের করা হয়। জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বসহ যে কোনো বিরোধে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে ভাড়াটে ফরিয়াদী ও সাক্ষীর নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নারী নির্যাতন আইনে মামলা করা হয়। আইনের ফাঁক-ফোকর খুঁজে মামলা দায়েরে সহযোগিতা করেন একশ্রেণির অর্থলোভী আইনজীবী। ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ স্টাফ ও উমেদাররাও এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলা দায়েরের পর এসব ফরিয়াদী ও সাক্ষীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। হয়রানির শিকার হন নিরীহ মানুষ। এ ধরনের ভুয়া মামলা দায়ের হওয়ায় চট্টগ্রামের তিন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাজট বাড়ছে বলে জানান আইনজীবীরা। এসব ভুয়া ও মিথ্যা মামলা দায়েরের ফলে সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়া ছাড়াও মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বিবাদীপক্ষ। মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনের ১৭ ধারায় প্রতিকারের বিধান থাকলেও ফরিয়াদী ও সাক্ষীদের হদিস না থাকায় কেউ প্রতিকার পায় না। ভুয়া নারী নির্যাতন মামলার শিকার এক ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে গত সোমবার অ্যাডভোকেট মাঈনউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। কমিটি চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় ভাড়াটে নারী ফরিয়াদী ও সাক্ষীদের তালিকা তৈরি ছাড়াও সহায়তাকারী অসত্ আইনজীবীদের শনাক্ত করে তাদের সনদ বাতিল করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামের কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী ইত্তেফাককে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)- এর ২৭ ধারার অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রতিদিন চট্টগ্রামে অসংখ্য হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হচ্ছে। বিশেষ করে ৯ (১)(২)(৩), ৯(৪)(ক), ৯(৪)(খ)/৩০ ধারায় সরাসরি পিটিশন আকারে ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় বহু নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করে সীমাহীন হয়রানি করা হচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা সম্পাদন করার সুযোগ থাকায় ভুয়া ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের পথ সুগম হয়েছে। হলফনামায় ফরিয়াদির ছবি ব্যবহার করা এবং চার্জ গঠন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে ফরিয়াদির সশরীরে আদালতে উপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২- এর পিপি অ্যাডভোকেট আবু নাসের বলেন, ফরিয়াদি ও সাক্ষী হিসেবে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে যে কোনো সময় যে কারো বিরুদ্ধে সহজেই নারী নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করা যায়। মামলা দায়েরের পর তদন্তের জন্য প্রেরণ করা হলে আগে থেকেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নেয়া লোকজন দিয়ে একতরফা জবানবন্দি প্রদানের মাধ্যমে মামলাটি আমলে নেয়ার সকল প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামি জানতেও পারেন না যে, প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে এ মামলায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। ভুয়া নারী নির্যাতন মামলার শিকার হয়ে গত সোমবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির কাছে প্রতিকার প্রার্থনা করে আবেদন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মুদি দোকানদার সিদ্দিক আহাম্মদ (৫০)। জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধের কারণে সিদ্দিক আহাম্মদের বিরুদ্ধে নারী ধর্ষণের চারটি মামলা দায়ের করেছে প্রতিপক্ষ। ২০১২ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসের ব্যবধানে এ চারটি মামলা হয়েছে বলে তার আইনজীবী মো. ইমরানুল হক ইত্তেফাককে জানান। তিনি বলেন, এই মামলাটির মতো আরো অসংখ্য ভুয়া ও প্রতিহিংসামূলক মামলা চট্টগ্রামের তিনটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তদন্ত কমিটির তদন্তে এগুলো বের হয়ে আসবে বলে আশা করি।