আমাদের নতুন প্রজন্মকে আমরা সবসময় বলি মানুষের মতো মানুষ হও। যদি ওরা কখনো জানতে চায় সে মানুষটা কেমন তার কোনো জবাব আছে আমাদের কাছে? দেশে যারা বড় বিখ্যাত কিংবা কৃতী তাদের একজনকেও আমরা অবিকৃত বা তর্কের বাইরে রাখতে পেরেছি? মানুষ হবার জন্য দোয়া আশীর্বাদের মুখে বললেও তাদের কাঁধের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন বইখাতার বোঝা। আমার পরিচিত আত্মীয় বাচ্চাদের কাঁধের ব্যাগ দেখে ভয় পাই আমি।
এখন আরেক বিপদ গ্রেড পাওয়ার প্রতিযোগিতা। জিপিএ ফাইভ নামের উল্লাস ধীরে ধীরে দানবে পরিণত হয়ে গেছে। তাই যদি না হবে তা না পেলে কেউ কেউ নিজের জান বিসর্জন দেবে কোন্ আনন্দে? এ কোন্ সমাজ নির্মাণ করছি আমরা? যেখানে শিশু-কিশোরদের কোনো মনোজগত্ নেই। এমনিতেই যন্ত্র মানুষের ঘুম সময় আবেগ কেড়ে নিয়েছে। এক বাচ্চার গল্প আগেও বলেছিলেম যে সবাইকে চমকে দিয়ে বলেছিল বড় হয়ে মোবাইল হতে চায়। সবাই তার এই কৌতূহলে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল কেন এই আগ্রহ। শিশুকন্যা তখন নাক ফুলিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানের সুরে বলেছিল, মা-বাবা দুজনই তার চাইতে মোবাইলকে বেশি ভালোবাসে, বেশি সময় ধরে বুকে পকেটে হাতে রাখে। তাই তার স্বপ্ন মোবাইল হওয়া। এটি ঠাট্টা মনে হলেও বড় বেদনার।
বাংলাদেশে মানুষ আগেও মেধাবী ছিলো। আমি বলবো অনেক বেশি মৌলিক ছিলো মানুষের জ্ঞান। আজ যৌগিক আর মিশ্র এসে সব খেয়ে ফেলছে। আসলে নাম্বার পেলে কি হয়? আসুন তো আমরা দুনিয়া ঘুরে দেখি কীর্তিমানদের অতীত কেমন ছিলো?
বিশ্বের প্রতিভাবান মানুষদের তালিকা করলে শীর্ষ পাঁচে থাকবেন আইনস্টাইন। বিশ্বসেরা এই বিজ্ঞানীর স্কুল তাঁকে রাখতেই চায়নি। তাদের ধারণা ছিলো এই বাজে ছাত্রের কাজ লেখাপড়া না করা। এখন যারা ভাবে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলেই জীবন সার্থক তারা কি জানে কোটি কোটি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পুষতে পারেন বিল গেটস? নিজেই জানতো ছাত্র হিসেবে পচা তাই পাস করায় মনোযোগ দেননি তিনি। দিলে হয়তো চাকুরে হতেন, বিশ্বের সেরা ধনী হতেন না।
গায়ক এলভিস প্রিসলি কে চেনো? আমি হাওয়াই বেড়াতে গিয়ে তাঁর বাড়ি মানে হলিডে হাউসের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কিছু সময়। এতো চমত্কার বাড়ি তো প্রেসিডেন্টেরও নাই। ইনি পাস করার ভয়ে স্কুল ছেড়ে পালিয়েছিলেন।
এই যে ফেসবুকের জনক জুকারবার্গের কপালে বিকল্প কিছু ছিলো না। ভাগ্যিস তিনি প্রথাগত পড়াশুনার জাল ভেদ করেছিলেন। তাইতো এমন সামাজিক মিডিয়া দিতে পেরেছেন। অনায়াসে আমরা পৌঁছে যাচ্ছি দেশ থেকে দেশান্তরে। মানুষ থেকে মানুষে। বেশির ভাগ পরীক্ষায় ভালো করা ছাত্রছাত্রীরা শেষে উচ্চমানের চাকরিজীবী ছাড়া কিছুই হতে পারে না। এই দুনিয়া অসাধারণ হয়েছে শিক্ষিত অতি মেধাবী আর মিডিওকারদের হাতে। নাম্বারধারীরা সেখানে গৌণ।
যে মানুষগুলোর কথা বললাম আমরা তাঁদের দলে। তোমরা যারা আজকে আঙুল উঁচিয়ে ভি সাইন দেখাতে পারোনি একদিন তোমার জন্যই সবাই হাত তুলে ভি সাইন দেখাবে। এটাই সত্য হোক। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে বা সমাজে স্কুল আতঙ্কের বিষয় না। বরং আনন্দের বিষয়। আমি এদেশে দেখেছি বাচ্চারা স্কুলে যাবার জন্য কান্নাকটি করে। কারণ স্কুল তাদের খেলাধুলা ও আনন্দের উত্স। টিচারদের রিভিউ মিটিং হয় এসব দেশে। ছাত্ররা ভালো না করলে দায় নিতে বাধ্য টিচার। বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। ছাত্রছাত্রীরা ভালো না করলে প্রফেসরকে জবাব দিতে হয় কোথায় ছিলো তাঁর ব্যর্থতা। এমন প্রক্রিয়া না থাকলে কেবল বাচ্চাদের দোষারোপ করে বলির পাঁঠা বানিয়েই চলবে সমাজ। আমরা মুখে বলছি ডিজিটাল আর কাজে একেবারেই সেকেলে আচরণ। নাম্বর যদি সবকিছুর নিয়ামক হতো এতদিনে আমাদের সমাজে যারা বেশি বেশি নাম্ব্বার পেয়েছিলো তারাই থাকতো মাথার ওপর। এমনটা কি হয়েছে আদৌ? তারপরও অভিভাবকদের মনে বাসা বেঁধে আছে এই জটিলতা।
সে কারণে আমাদের অভিভাবকদের ধারণা বদলানো দরকার। সমাজ এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মূলত ক্লিব আর শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বড় মানুষ জন্মাবে না এভাবে। জন্মাবে না স্বপ্ন দেখার মানুষ। বাচ্চা কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীদের ওপর চাপ কমানো না গেলে আমরা কিছুতেই বড় জাতি সার্থক জাতি হিসেবে মাথা তুলতে পারবো না। মানুষের মত মানুষের সংজ্ঞা জানুন। সীমানা ঠিক করুন। তারপর নতুন প্রজন্মকে এগুতে দিন। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার মানে যে মনে-প্রাণে দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে বড় হবার জন্য সাধনা করা, মুক্তমনের একজন হওয়া সেটা বুঝতে দিন তাদের। তাদের মনের আকাশ খুলে দিন। তা হলেই তারা পথ খুঁজে পাবে।
n লেখক :সিডনি প্রবাসী লেখক
