আগামী অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে অর্থবছরের ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। এই বিবেচনায় আদায়ের উপর প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা ২৫ শতাংশের উপরে ঠেকবে।
আগামী অর্থবছর নির্বাচনী বছর হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবেলা করতে হবে অর্থনীতিকে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য গতি হারালে আয় কমবে। কমবে রাজস্ব আদায়। অন্যদিকে নতুন বাজেটে মোবাইল ফোন ও সিগারেট কোম্পানি ছাড়া দৃশ্যমান বড় ধরনের কোন কর আরোপ হয়নি। এইসব বিবেচনায় রাজস্বের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এতে বলা হয়, বাজেটে সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো রাজস্ব আদায়ের প্রক্ষেপণ। আগামী বছর অন্তত ১০ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আদায় হতে পারে। সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মোট রাজস্ব আদায়ের ৮৪ শতাংশই আসবে রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে। বাজেটে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ৪৬ শতাংশ আয়কর খাত থেকে আসবে বলে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু আগামী অর্থ বছরের মতো জটিল সময়ে এতবড় লক্ষ্যমাত্রা আদায় করা যদি সম্ভব হয় তাহলে নিঃসন্দেহে রাজস্ব বোর্ড অভিনন্দন পাবে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এখনো মনে করেন এ লক্ষ্যমাত্রা বেশি বড় নয়। তাই এটি অর্জন করা খুবই সম্ভব। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে গতকাল শুক্রবার তিনি এমন কথা বলেন।
তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানও মনে করেন, বড় ধরনের কর আরোপ ছাড়া রাজস্বের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। এটিকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবেই মনে করেন এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান।
এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুল্ক ৩ হাজার কোটি টাকা ও ভ্যাট ২ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রার উপর আসছে অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ২১ শতাংশ দেখানো হলেও অর্জনের উপর প্রকৃত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা হবে অন্তত ২৬ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেনঃ এ বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ বা ২৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হলে তা হয়তো বাস্তবায়নযোগ্য ছিল। বিনিয়োগে মন্দা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত, এই অবস্থায় প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের কাছাকাছি না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। চলতি বছরের অর্জন আর সার্বিক বিবেচনায় প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আহরণ করে থাকে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আয়কর খাতে চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৪৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ভ্যাট বাবদ আদায় করতে হবে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। আর গত বছরের তুলনায় সামান্য বাড়িয়ে শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। অন্যান্য কর বাবদ আরো ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রাকে ইতিমধ্যে অবাস্তব আখ্যা দিয়েছে খোদ এনবিআর। এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বিভিন্ন সময়ে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা সর্বোচ্চ এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা করার জন্য চেষ্টার কমতি রাখেননি। এনবিআরের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তারা মনে-প্রাণেই বিশ্বাস করেন, অর্থমন্ত্রীর ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আগামী অর্থবছরে আদায় করা কোনভাবেই তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য আগামী অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা হওয়ার বিষয়ে এখনো হাল ছাড়েনি এনবিআর। সংস্থাটি মনে করছে, আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যায়ে হলেও সংশোধন করে এই লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজারে আসবে। ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে এনবিআরের বাজেট প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী বছর যদি জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয় তাহলে অর্জন করা সম্ভব। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধি কি সম্ভব? তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস এক পর্যায়ে এটি (রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা) যৌক্তিকীকরণ হবে।
এ বক্তব্যের সাথে সুর মিলিয়েছে সিপিডিও। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে হলেও রাজস্বের এই লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।
