ভূমির অধিকার প্রশ্নে আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে গঠিত ভূমি কমিশন-এর কতিপয় ধারা ও উপধারার সংশোধনীর অনুমোদন দেয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত পাহাড়ে বাঙালি ও পাহাড়িদের মধ্যে ভূমির ভবিষ্যত্ অধিকার প্রশ্নে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে শুরু করেছে। ভূমির অধিকার প্রশ্নে কার্যত পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির আশঙ্কায় চরম উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ভুগছেন পাহাড়ের মানুষ। এ প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার এমপি বলেছেন, পাহাড়ে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতেই একটি মহল পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইনকে ইস্যু করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করছে। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, কোন বিচ্যুতি হয়নি এ আইনে। তাছাড়া কোন আইনে পাহাড়ের মানুষ সম্প্রদায়গতভাবে বৈষম্যের শিকার হোক তা সরকার চায় না।
উল্লেখ্য, ভূমি কমিশনের আইন সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা, চেয়ারম্যান, সচিব ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে জটিলতায় বিগত ১০ মাস ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সকল কাজকর্ম স্থবির হয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময় সরকার ভূমি কমিশন আইনের বেশ কিছু ধারার সংশোধনের মাধ্যমে কমিশনকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারের এ উদ্যোগের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন আশঙ্কায় বাঙালিদের বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনও মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত সংশোধিত আইনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইতিমধ্যে সংশোধিত পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের অনুমোদনের প্রতিবাদে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বাঙালিদের সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ কর্মসূচি পালনসহ সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে। সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ঐক্য পরিষদ, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ নামক বাঙালিদের প্রভৃতি সংগঠন খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে একাধিক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদনের বিরোধিতা করে বলেছে, সরকারের এই উদ্যোগে বাঙালিরা গভীরভাবে মর্মাহত ও আতংকিত। এ আইন পাসের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি জনগণ তাদের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এ আইন সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং পার্বত্য এলাকায় বাঙালি ও সেনাবাহিনীর অবস্থান ও সরকারের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দেবে। উপজাতীয় নেতাদের দৌরাত্ম্যে ভূমিহীন হয়ে পড়বে বাঙালিরা।
অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনরত ৮টি সংগঠন যথাক্রমে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটি, সাজেক নারী সমাজ, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ও প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড—প্রথাগত ভূমি আইনের স্বীকৃতি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনের দাবি তুলেছে। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, ‘গত কয়েক দশকে ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন হাজার হাজার একর জমি জোরপূর্বক অথবা নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে বহিরাগত কর্তৃক বেদখল করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে হাজার হাজার পাহাড়ি পরিবার নিজ জমি থেকে উত্খাত ও নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্মরণাতীতকাল থেকে বিদ্যমান প্রথাগত ভূমি অধিকারের ভিত্তিতে প্রণীত একটি শক্তিশালী আইন ছাড়া এসব বেদখলকৃত জমি ফিরে পাবার কোন সম্ভাবনা নেই।’ এছাড়া নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের স্বার্থে সংবিধানে প্রথাগত ভূমি আইনের স্বীকৃতি প্রদান, ভূমি কমিশন আইনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি’র যথাযথ ব্যাখ্যা, ৭(৫) ধারাকে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক করা এবং ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির শুনানিতে হেডম্যান ও কার্বারিদের লিখিত মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী প্রস্তাবে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামত ও অনুমোদন-এর বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া সংশোধনী প্রস্তাবে কমিশনের প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের জন্য ৩ মাস সময়ও বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়ে সংশোধনী প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ প্রস্তাবসমূহ হচ্ছে যথাক্রমে কমিশনের বৈঠকে সার্কেল চিফের অনুপস্থিতিতে তার প্রতিনিধিকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়া, অবৈধ দখল, অবৈধ বন্দোবস্ত দেয়ার বিষয়টি পার্বত্য ভূমি কমিশন নিষ্পত্তি করবে ও আইনের বাইরেও বৈধ মালিকদের হাতছাড়া হওয়া ভূমির জটিলতাও সমাধান করা হবে এবং কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ ও কমিশনের প্রশাসনিক পদে নিয়োগে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গৌষ্ঠীর প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
