নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আবার অনড় অবস্থান নিয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। একদিকে পদ্ধতিগত দিক থেকে এখনও প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের অবস্থান বিপরীতমুখী। অন্যদিকে এ নিয়ে আলোচনার স্থান ও ধরন নিয়েও উভয়ে উল্টো রথে। সরকার বলছে, অনির্বাচিত ও নির্দলীয় কোনো সরকার ব্যবস্থা তারা মানবে না, বিরোধী দলের সাফ কথা-নির্বাচনকালীন সরকার হতে হবে নির্দলীয়। তারপরেও এ নিয়ে বিরোধী দল আলোচনা করতে চাইলে তা জাতীয় সংসদেই হতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে সরকার। বিরোধী দল বলেছে, এ নিয়ে তারা সংসদে কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করবে না, আলোচনায়ও যাবে না। সংলাপ বা আলোচনা এখনও শুরু না হওয়ার জন্যও পরস্পরকে দুষছে সরকার ও বিরোধী দল।
দু’পক্ষের এই বিপরীত অবস্থানের কারণে সংলাপের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ‘সংলাপের দুয়ার আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সংলাপের জন্য দু’পক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হবে, না নিলে আলোচনা হবে না। আলোচনা না হওয়ার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করা, এটা রাজনৈতিক কলাকৌশল, কেয়ামত পর্যন্তই এই দুটি দল পরস্পরকে দোষারোপ করে যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বলেছেন, বিরোধী দলই আলোচনা চায় না। সংসদে জমা দেয়া মুলতবি প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে বিএনপি বিশ্ববাসীকে একথাই জানিয়ে দিল। আগেরদিন শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মুলতবি প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে বিএনপিই সংলাপের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা তো প্রতিদিনই আলোচনার কথা বলছি। সরকারই তো শুনছে না। সরকার প্রথমে বলল-চিঠি দেবে, পরে আবার বললো-চিঠি দেবে না। এভাবে সকালে এককথা, বিকেলে আরেক কথা বলে সরকারই বরং দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে। আমরাও (বিরোধী দল) বিভ্রান্ত। সুতরাং সরকারকে আগে মনস্থির করতে হবে-তারা আসলে কী চায়। এটা যদি লিখিতভাবে আমাদের জানায় তাহলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।
প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন ‘সংলাপের দরজা বন্ধ’ এবং ‘বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় সেভাবে এবং আমাদের সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না’, তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমস্যা সমাধানের সুযোগ এখনও রয়েছে। তিনি এও বলেছেন, তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়েই নির্বাচনকালীন সরকার হতে হবে। সৈয়দ আশরাফ গতকাল বলেছেন, বিএনপি সংসদে আবার মুলতবি প্রস্তাব দিলে সরকার এ নিয়ে আলোচনা করবে। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, সংসদে আলোচনা করে কখনও এই ধরনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আগে বাইরে দু’পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছানোর পরেই কেবল সংসদে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। অন্যথায় সংসদে দু’পক্ষের মধ্যে শুধু বাহাস কিংবা পাল্টাপাল্টি অর্থহীন বক্তব্য হবে, কোনো সুরাহা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়, কখনও সিদ্ধান্ত হয় না। সংসদে মুলতবি প্রস্তাব কেন, কোনো প্রস্তাবই দেবে না বিরোধী দল।
সংলাপের এবং রাজনৈতিক সংকট, বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কখনও এই সংকট নিরসন হয়নি। এমনকি সংসদেও আলোচনার মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যা সমাধানের দৃষ্টান্ত বিরল। ১৯৯৬ সালেও তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রবর্তন করেছিল বিএনপি। ২০০৬ সালের ঘটনাও প্রায় একই। এসময়ও দু’দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ হলেও তা ছিল নিষ্ফল।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখন আওয়ামী লীগও বিএনপির পথ ধরেছে। এখনকার সরকারও মনে করছে, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী, এ নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার কী আছে। সূত্র মতে, দলটির নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে- কোনো অবস্থাতেই তারা অনির্বাচিত-নির্দলীয় সরকারের দাবি মানবে না। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং সেই সরকারের প্রধানও থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিএনপির দাবি মানার কোনো সুযোগ নেই। তারপরেও আমরা বলেছি, নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দল সংসদে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু বিএনপি সেপথে না গিয়ে, ষড়যন্ত্র খুঁজছে।’
সরকার ও বিরোধী দলের এই অবস্থানের মধ্যেই জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দল সংসদে আলোচনা করতে চাইলে সে সুযোগ এখনও আছে।
