রাজস্ব আদায়ে শঙ্কা

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৩, ২২:৫৩
আগামী অর্থবছরের (২০১৩-২০১৪) প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কতগুলো নিয়ামক কাজ করবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী বছরে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া প্রভৃতি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যেও এসব উঠে এসেছে। এ বাজেটে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন তিনি। কিন্তু পুরো বাজেট বক্তব্যে তিনি যেসব নেতিবাচক বিষয়ের অবতারণা করেছেন তাতে এ রাজস্ব আদায় হবে না বলে যে কারো কাছে প্রতীয়মান হতে পারে। অর্থনীতিবিদদেরও একই বক্তব্য। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, বর্তমান বছরে নির্বাচনী হাওয়ার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা ইতস্তত করছেন। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হয়তো কিছুটা হ্রাস পাবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগ কমে যাবার প্রভাব সরাসরি পড়বে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে। কারণ বিনিয়োগ কম হলে আমদানি শুল্ক, ভ্যাটসহ বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আদায় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আহরণ করে থাকে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আয়কর খাতে চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৪৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা, ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ভ্যাট বাবদ ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। আর গত বছরের তুলনায় সামান্য বাড়িয়ে শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। অন্যান্য কর বাবদ আরো ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বিগত সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামনের কয়েকমাসের পরিস্থিতির যে ইংগিত দিয়েছেন তাতে প্রস্তাবিত রাজস্ব আদায় করা একেবারেই অসম্ভব হবে। যেমন বাজেট বক্তব্যের সমন্বয় ও সংশোধন পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিগত আড়াই মাসে দেশে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টির প্রয়াস চলে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য যথেষ্ট অসুবিধার সম্মুখীন হয়। তিনি বলেন, সহিংস হরতাল এবং জামায়াত-শিবিরের নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রয়াস বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হয়। আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক আদায় বছরের প্রথমার্ধে কমে গেলেও শেষদিকে এসে সম্পূরক শুল্ক আদায়ে গতি এসেছে। প্রত্যক্ষ কর আদায়ে ঊর্ধ্বগতি বহাল আছে। অবশ্য বাজেট বক্তৃতার অগ্রভাগে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৯০ সালের পর আমাদের চারটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা দেখেছি যে বছর সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সে বছর প্রবৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক কমে যায়। এ বক্তব্যের শেষে তিনি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করলে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম নয় বলে আমি মনে করি। তবে অর্থমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিহার করা গেলে এ প্রবৃদ্ধির হার আরো বাড়বে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে যে কয়েকটি নেতিবাচক প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্ব মন্দা, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া। এ দুটি নিয়ামক আগামী অর্থবছরে, অন্তত নির্বাচনকালীন সময়েও বহাল থাকবে বলে তিনি আশংকা জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রাক্কলিত রাজস্ব আদায় অসম্ভব হবে বলে অনেকে মনে করছেন। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। যে কারণে অর্জিত হয়নি সে কারণগুলো এখনো বিদ্যমান। সুতরাং সামনের বছরে যে আদায় হবে না সে কথা বলা যায়। নির্বাচনী বছরের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এ কথাটি ঠিক নয়। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়তেও পারে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে বিনিয়োগ বাড়ে, ব্যয় বাড়ে। অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে অর্থবছরের ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর।