ব্যাংকিংয়ের সফলজন

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ১৯:৫৮
সার্বিক মূল্যায়নে ব্যাংকিং পেশা একটি চমত্কার পেশা। এ পেশায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি নিজেদের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এসব কারণে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার এখন অনেক মেধাবীর স্বপ্ন। তবে এ রকম স্বপ্ন নিয়েই ব্যাংকিং পেশায় এসেছিলেন জাকিয়া সুলতানা এবং নিজেকে প্রমাণও করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা ব্যাংকে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠানটির ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রজন্মকে তিনি শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প, জানিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের নানা দিক সম্পর্কে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। অনেক কিছুর ভিড়েও চাইতেন এটা যেন ঠিকঠাক থাকে। সময়টা এই শতকের শুরুর দিকে, জাকিয়া সুলতানা চাইছিলেন সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে। সেই মাফিক এগিয়েও গেলেন অনেক দূর। এর মাঝেই সেই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাংক ঢাকা ব্যাংকে চাকরির সুযোগ পেয়ে যান। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন সেখানে। অবশ্য এ সময় বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতেও সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু সব ভেবেচিন্তে থেকে গেলেন ব্যাংকেই। ব্যাংকিংয়ের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও কাজের ক্ষেত্র তাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে উত্সাহিত করে। নিজের পরিবারেরই সম্প্রসারিত অংশ মনে করেন ঢাকা ব্যাংককে। আর এই কথা স্পষ্ট, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে শুধুই কাজের খাতিরে কাজ করা নয় মনোভাবের সাথে আন্তরিকতা যোগ করা যায়, তখন নিজের পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এমনই ভাবনায় পথ চলেছেন জাকিয়া সুলতানা। যার ফলাফল—একেক করে অনেকগুলো ধাপ পার করে আজ তিনি সিনিয়র অ্যাসেস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনে। জাকিয়া সুলতানার এই পথ পরিক্রমাটাই বলে দেয়, ব্যাংকিং মাধ্যমে এসে পরিপার্শ্বের সাথে কতটা মানিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কাজের পরিবেশটা কীভাবে গুছিয়ে নেন? জানালেন, প্রথমত তিনি টিম নিয়ে কাজ করতে স্বাছন্দ্য বোধ করেন। দ্বিতীয়ত, সরাসরি গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হয় এ ধরনের কাজে। গ্রাহকদের দেওয়া যেকোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা অথবা অনুরোধ বা অভিযোগ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা খুবই প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নিজের যোগাযোগ দক্ষতাটা খুব পোক্ত হওয়া চাই, সেটা ব্যাংকের একজন কর্মচারী থেকে শুরু করে গ্রাহক হতে আসা ক্লাস টুতে পড়ুয়া ছেলেটার সাথেও। জাকিয়া সুলতানার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ব্যাংকিংয়ে আমাদের দেশে কাজের সুযোগ কেমন? তিনি জানান, প্রতিবছরেই বাজার চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের শাখা বিস্তৃত করে যাচ্ছে। ফলে দরকার হচ্ছে দক্ষ জনবলের। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সংখ্যা ও শাখা, কার্যক্রম বৃদ্ধি, উন্নত গ্রাহকসেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে বলে এখানে ক্যারিয়ার গড়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিবছরই ব্যাংকগুলোতে লোক নেওয়া হচ্ছে প্রচুরসংখ্যক। আর এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে তরুণদের। ব্যাংকিং খাতে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ সম্পর্কে জাকিয়া সুলতানা বলেন, সুন্দর কাজ করার পরিবেশ, সুন্দর ভবিষ্যত্ ও মেধার মূল্যায়নই তরুণদের আকর্ষিত করছে ব্যাংকিং খাতে। তাছাড়া একজন মেধাবী ব্যাংকার অতি অল্প সময়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। আমাদের দেশে অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে ব্যাংকিং পেশায় নিরাপত্তা অনেক বেশি। শুধু যে চাকরির নিরাপত্তা তাই-ই নয়, এ ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য যত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা তাদের এ পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত করছে। আর তরুণদের কাছ থেকেই মূলত আসে ব্যতিক্রমী সব ধারণা। তাই আগামী দিনগুলোতেও ব্যাংকে তরুণদের চাহিদা বাড়তেই থাকবে বলে তিনি মনে করেন। আরও জানালেন, তারা নিয়োগের সময় একাডেমিক ফলাফলের বাইরে শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের দিকেও গুরুত্ব দেন। কারণ, একটা মানুষের সুষ্ঠু বিকাশে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিংয়ে কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে জানিয়ে জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ব্যাংকগুলো তাদের কর্মসূচি চালাতে খুলছে নতুন নতুন শাখা। সেই সঙ্গে খোলা হচ্ছে বিভিন্ন বিভাগ। ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আধুনিক ধারার ব্যাংকে সাধারণত বিনিয়োগ, কর্পোরেট ব্যাংকিং, প্রশাসন ও তদারকি, বিপণন, জনসংযোগ ইত্যাদি বিভাগ থাকে। তাই ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে বিভাগের কাজ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লোকের চাহিদাও।’ নতুন প্রজন্মের কাজের যে অনেক সুযোগ এখানে, সে কথা স্পষ্ট। কিন্তু এই সময়ের তরুণরা কাজে যোগদানের পর কেমন করছে? স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তরুণ একটা দল নিয়েই কাজ করতে হয় জাকিয়া সুলতানাকে। তাদের কাজ কেমন লাগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন। চারপাশের সবকিছুর প্রতি তাদের কৌতূহল রয়েছে। প্রযুক্তি তাদের সেই আগ্রহকে আরও উস্কে দিচ্ছে। ফলে তাদের জানার পরিধিও বাড়ছে দিন দিন। যা চ্যালেঞ্জিং মার্কেটে টিকে থাকার জন্য খুব জরুরি। নিজেকে যত আপ-টু-ডেট রাখা যাবে, ততই কিন্তু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে।’ নতুন প্রজন্মের প্রতি তার পরামর্শ হলো—এখনকার প্রজন্ম যেহেতু অনেক বেশি সচেতন এবং তাদের অনেক জানাশোনা আর কাজ দেখার সুযোগ রয়েছে। তাই একাডেমিক বিষয় আর এই গুণগুলোর সমন্বয় যদি তারা ঘটাতে পারে, তাহলে তাদের জন্য কর্পোরেট দুনিয়ায় পথচলা অনেক সহজ হবে। সাধারণত কাজ করতে করতেই নিজের দায়িত্ববোধটা জন্ম নেয়, জানা যায় অনেক কিছু। এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় গুণ তাদের গ্রহণ ক্ষমতা অনেক বেশি। প্রযুক্তির যেকোনো বিষয় তারা খুব সহজে বুঝে যায়, আর সেটা এই সময়ে কতটা জরুরি সেটা বোধকরি নতুন করে বলার কিছু নেই। বর্তমান সময়ে এসএমই উদ্যোগের ফলে মাঝারি অনেক শিল্পের বিকাশ ঘটছে আর এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের রয়েছে অনেক বড় ভূমিকা, এ বিষয়ে আলোকপাত করা হলে জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘এসএমই আসলেই ক্ষুদ্র আর মাঝারি শিল্পের বিকাশে অনেক বড় অবদান রাখতে পারে। সব ব্যাংকেরই উচিত সীমিত লাভে হলেও এই দিকটাতে এগিয়ে আসা, কারণ তাদেরকে যদি উত্সাহিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়িকভাবে লাভবান করা যায়, সেটা সর্বোপরি সবার জন্যই মঙ্গলই হবে।’ তার প্রতিষ্ঠানেও এসএমই ডিভিশন রয়েছে, তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে এসএমই সার্ভিসই আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পেছনে বড় নিয়ামক হবে।’ বহুমাত্রিক গুণের এই মানুষটা কাজের জগতে যতটাই আন্তরিক, তেমনি পারিবারিক জীবনেও। জাকিয়া সুলতানার বাবা আখতার হামিদ ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর মা আফরোজা খানম ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। স্বামী চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন তার ব্যস্ত জীবনের সঙ্গী। তাদের দুই কন্যা স্নেহা আর শ্রেয়াকে নিয়েই কেটে যায় অবসর। সময় পেলেই বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়েন তারা। দুই প্রজন্মের এই যে মেলবন্ধন আর আত্মার সম্পর্ক, এটা নিঃস্বার্থ। এই স্বপ্নেই তো আমরা হেঁটে চলি সম্ভাবনার পথে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। জাকিয়া সুলতানা ডাকনাম :অনু জন্মতারিখ ও স্থান :২১ মার্চ, নওগাঁ মায়ের নাম :আফরোজা খানম বাবার নাম :আখতার হামিদ প্রথম স্কুল :শেরে বাংলা নগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :পরিবারের সবাই প্রিয় উক্তি :মনেরে আজ কহো যে, ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লও সহজে। প্রিয় পোশাক :শাড়ি অবসর কাটে যেভাবে :বাচ্চাদের সাথে সাফল্যের সংজ্ঞা :যেটা করতে চাই সেটা ঠিকমতো করতে পারা।