প্রস্তাবিত বাজেট কতটা নারীবান্ধব?

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:০৩
চলতি বাজেট ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার। আগামী অর্থ বছরের (২০১৩-১৪) জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার। প্রস্তাবিত বাজেটে নারীদের আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চলতি বাজেটে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা করে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল যা আগামী বছর ৪০ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেই প্রণয়ন করা হবে। ২০১১-২০১২ অর্থ বছরে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল শুধুমাত্র ৪টি মন্ত্রণালয়ের জন্য। আগামী অর্থ বছরে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের ৫% জেন্ডার বাজেটিং-এ বরাদ্দ করা হবে। চলতি অর্থ বছরে নারীর উন্নয়নে ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৫৪ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থ বছরে কোন কোন মন্ত্রণালয়ে নারীর জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হলেও কিছু কিছু মন্ত্রণালয়ে তা কমিয়ে আনা হয়েছে। নারীর উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচি যা বর্তমান বছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আগামী অর্থ বছরের লক্ষ্য। এবছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মোট ব্যয়ের ৩৮.৭৬ শতাংশ নারী কল্যাণে ব্যয় করা হয়েছে। আগামী অর্থ বছরে তা বাড়িয়ে ৪০.৮৩ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে দরিদ্র গর্ভবতী মা ও গর্ভের সন্তানের পুষ্টির চাহিদা পূরণে এক লাখ এক হাজার ২০০ জন গর্ভবতী মাকে প্রতি মাসে ৩৫০ টাকা করে দেয়া হয়। আগামী অর্থ বছরে তা ১৫% বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে । বর্তমানে বয়স্ক ভাতা ভোগী দুঃস্থ, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা ৩৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন, তাদের সংখ্যা ১০% বাড়ানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে আগামী বছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মোট বাজেটের ৩২.৬৮ শতাংশ নারী উন্নয়নে ব্যয় হবে যা বর্তমান অর্থ বছরে ছিল ৪৪.২৬ শতাংশ। এখানে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মোট বরাদ্দ ৯ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে নারী উন্নয়ন তহবিলে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এর আওতায় বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ১০ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প চলছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবছর ৭টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে এবং আগামী অর্থ বছরে তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। আগামী অর্থ বছরে নানা খাতে নারীদের জন্য বরাদ্দ ও তার ফলাফল সম্পর্কে জানতে কথা হচ্ছিল সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সাথে। ড. ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ আগামী অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে জিডিপির ৫.১৮ অংশ ধার্য করা হয়েছে। আগামী বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট বাজেটের ২৭.১২ শতাংশ করা হয়েছে যা চলতি বছরে ছিল ২৬.২৮ অংশ। তবে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ অধঃমুখী। সকল মন্ত্রণালয়ে নানা প্রকল্পে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট ব্যবহার করা হলেও, সেসব প্রকল্পের সবই শুধুমাত্র নারীদের জন্য নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রভৃতি কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া আর কোন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাগুলো শুধু নারীদের জন্য বরাদ্দ থাকে না। তাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নানা খাতে বরাদ্দের কতটুকু নারীর সরাসরি উপকারে আসছে, সে হিসেবটি অপরিষ্কার থেকে যাচ্ছে। তাই আলাদাভাবে শুধুমাত্র নারীদের জন্য মোট বরাদ্দের একটি তালিকা থাকা প্রয়োজন। তবেই তার কতখানি কার্যকর হচ্ছে বা সেক্ষেত্রে কী কী দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা পরিষ্কার হবে। আগামী বাজেটে নারীদের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত আয়কে করমুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ ব্যক্তির জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। সরকারের এই পদক্ষেপটি প্রশংসনীয়। গত বছর নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকা, কিন্তু তা ব্যবহার না হওয়ায় এবছর সেক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, শুধু নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখলেই হবে না, তাদের ব্যবসা ও বিনিয়োগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কী ধরনের পণ্য বাজারে চলবে, কীভাবে সংস্থা পরিচালনা করবে, সে ব্যাপারে সঠিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শুরু করা প্রয়োজন। এছাড়াও দুঃস্থ , বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের জন্য বরাদ্দ ভাতা বাড়ানোতেও লাভ হয়েছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী তার পরিমাণ এখনও অপ্রতুল। ভাতার ক্ষেত্রে দেখা যায় দুঃস্থ, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের তা পাবার জন্য নানা মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয় ও তাই প্রকৃত বরাদ্দ পাওয়া থেকেও অনেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা স্থানীয় প্রভাবশীল ব্যক্তিদের কাছে পরিচিত তারাই শুধু পাচ্ছে। তাই প্রশাসনের কার্যক্রম উন্নত করতে হবে, তবেই প্রকৃত বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার হবে । আগামী বাজেটে কর্মজীবী নারীদের জন্য জেলায় জেলায় নারী হোস্টেলের প্রকল্প বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। নারীদের জন্য আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যেটি তাদের সাবলম্বী হতে সাহায্য করবে। আগামী বাজেটে প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে নারীদের যাতায়াতের জন্য আরো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে তাদের পদে পদে নানা আজেবাজে মন্তব্য, ধাক্কাধাক্কি বা খারাপ ব্যবহারের শিকার হতে হবে না।