গৌরনদীর দই, একবার পাইলে আর একবার কই। ভোজন বিলাসীদের কাছে বরিশালের গৌরনদীর দধি-মিষ্টি ছাড়া ভোজন রসনা পুরোটাই যেন অসমাপ্ত থেকে যায়। ঐতিহ্যগত কারণে প্রাচীন কাল থেকেই ক্রেতাসাধারণের কাছে গৌরনদীর দধি-মিষ্টি লোভনীয় সামগ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ ঐতিহ্য এখন শুধু দেশেই নয়; গৌরনদীর দধি, মিষ্টি ও ঘি’র সুনাম দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পরেছে। সুদূর আমেরিকা, ইটালী, সৌদী আরবসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গৌরনদীর দই মিষ্টির দোকান। ইতোমধ্যে পুরো আমেরিকায় গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারটি বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। বাংলাদেশিদের ন্যায় বিদেশিরাও গৌরনদীর দই-মিষ্টি খেয়ে পরম তৃপ্তি লাভ করছেন। নতুন জামাইকে আদর কিংবা অফিসের বসেক খুশিসহ যেকোন কাজের তদবিরের জন্য প্রায় আড়াই’শ বছরের পুরনো দেশের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী বরিশালের গৌরনদীর দধি, মিষ্টি ও ঘি’র কোন বিকল্প নেই। সারাদেশে গৌরনদীর দধি, মিষ্টি, ঘি’র যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। বিবাহ, বৌ-ভাত, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন তদ্বিরে গৌরনদীর দধির জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসেন গৌরনদীতে। প্রতিদিন শত শত মণ দধি, মিষ্টি এখান থেকে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, দিনাজপুর, সিলেটসহ বিভিন্ ্নস্থানে চালান দেয়া হয়। দেশের বাইরেও ব্যাপকভাবে গৌরনদীর দধি, মিষ্টি, ঘি’র সুনাম রয়েছে। গৌরনদীর দধির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ১০/১৫ দিনেও স্বাভাবিক আবহাওয়ায় নষ্ট হয় না। যেকোন যানবাহনে সহজে বহন করা যায়। শুকনো মিষ্টি এক মাসে ও ঘি এক বছরেরও নষ্ট হয় না। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে অধিক মুনাফার কথা না ভেবে গুণগত মান ও সুনামকে ধরে রাখতে গৌরনদীর ঐতিহ্য দধি-মিষ্টি ও ঘি তৈরি করে আসছেন গৌরনিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী শচীন ঘোষ। গৌরনদীতে তার দই-মিষ্টির সুনাম সবচেয়ে বেশি। শচীন ঘোষের দইয়ের জন্য পাগল সবাই। প্রায় (৭৫) বছরের বৃদ্ধ শচীন ঘোষ দীর্ঘ ৫০ বছর যাবত্ এ পেশায় নিযুক্ত রয়েছেন। দুধ ক্রয় থেকে দই-মিষ্টি তৈরির সব কাজই তিনি নিজেই তদারকি করেন। খাটি দুধ চিনতে তার কোন মেশিনের প্রয়োজন হয় না। তিনি হাত দিয়েই দুধের ঘনত্ব নির্ণয় করেন। তিনি সাক্ষাতে এ প্রতিনিধিকে জানান, ভাল দই-মিষ্টি তৈরি করতে খাঁটি দুধের প্রয়োজন। এক শ্রেণীর অসত্ ব্যবসায়ী দুধে ভেজাল দিচ্ছে। ভেজাল দুধে তৈরি মিষ্টির মান ভাল হয় না। গৌরনদী বন্দরের শ্রীগুরু মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী বলরাম ঘোষ বলেন, বাবার (সুশীল ঘোষের) পাশাপাশি গত ২০ বছর ধরে আমি এ পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। সমপ্রতি বাবার মৃত্যুর পর আমিই বাবার পেশাকে আঁঁকড়ে ধরে রেখেছি। তিনি আরও বলেন, আমার বাবা সুশীল ঘোষ ৫০ প্রকারের লোভনীয় মিষ্টি তৈরি করতে পারতেন। তিনি (সুশীল ঘোষ) বংশপরম্পরায় দীর্ঘ ৫০ বছর সুনামের সহিত এ ব্যবসা করে গেছেন। তার মৃত্যুর পর তারই প্রতিষ্ঠিত গৌরনদী বন্দরের শ্রীগুরু মিষ্টান্ন ভান্ডারের সুনাম ধরে রেখেছেন সুশীল ঘোষের পুত্র বলরাম ঘোষ। বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে ২০ প্রকারের মিষ্টান্ন দ্রব্য তৈরি করা হয়। এরমধ্যে দধি, চমচম, কালোজাম, শুকনো মিষ্টি, লাদেন মিষ্টি, বড় রসগোল্লা, রসমালাই, রশমঞ্জরি, ছানার সন্দেশ, ক্ষীরপুরী, মাওয়া, ছানার জিলাপি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও গৌরনদীর স্বপন ঘোষ, জগদীশ ঘোষসহ প্রায় ৭/৮টি মিষ্টির দোকানেও হরেক রকমের মিষ্টি তৈরি হচ্ছে।
