সোনারগাঁওয়ে ফোর মার্ডারের মূল হোতা শাহাদাত

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২৩:০১
সোনারগাঁওয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বাসায় চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের ঘটনা ঘটে তার বড় ছেলে শাহাদাতের পরিকল্পনায়। পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে খুনিরা রফিকুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা ইসলাম সোমা ও রফিকুলের শ্যালক রানা এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রেখা ও মনিকে জবাই করে। পুলিশ হেফাজতে শামীম রেজা মৃত্যুর আগে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য দেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান রফিক তার ছেলে শাহাদাতকে ওই হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে শামীমকে পুলিশি হেফাজতে পৃথিবী থেকে চির বিদায় দেয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা উেকাচ দিয়েছিল। আর টাকা খেয়ে তিন পুলিশ কর্মকর্তা শামীমকে থানায় আটকে ব্যাপক নির্যাতন চালান। শামীমের স্বজনরা বলেন, শামীম যাতে আদালতে জবানবন্দি দিতে না পারে সেজন্য তার উপর বর্বরোচিত নির্যাতন চলে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার আশা পূরণ হয়নি। মৃত্যুর দুইদিন আগে ২০ মে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে এম মহিউদ্দিনের খাস কামরায় ওই ফোর মার্ডারের ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি খুনিদের নাম-পরিচয় ও খুনের মোটিভসহ বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেন। এর পর পরই শামীমকে কারাগারে পাঠানো হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কারা কর্তৃপক্ষ ২২ মে শামীমকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে সেখানে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জানা গেছে, পুলিশি নির্যাতনে শামীমের শারীরিক অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে, আদালত থেকে পাঠানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিল। এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। জবানবন্দিতে শামীম বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সোনারগাঁও থানাধীন ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়কের পাশে মেঘনা ভিলেজ হাইওয়ে ক্যাফের বাগানে বসে শাহাদাত শামীমকে জানান,তার সত্ মা সোমার বাড়িতে নগদ ২০/২৫ লাখ টাকা ও অনেক স্বর্ণালংকার রয়েছে। এগুলো উদ্ধার করতে পারলে শামীম, আশরাফুল ও সোমার খালাতো ভাই রাজীবকে পাঁচ লাখ টাকা দেয়া হবে। আরেকটি কিলার গ্রুপকে শাহাদাত ভাড়া করে সোমাকে হত্যা করার জন্য। ওই কিলার গ্রুপে ছিল যাত্রাবাড়ীর দুই কিলার সোহাগ ও মিঠু। শাহাদাতের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজীব সোমার বাড়িতে রাতে অবস্থান করবে এবং খুনি দরজা নক করলে তিনি দরজা খুলে দিবে। পরিকল্পনামতে ১৯ এপ্রিল রাতে সিএনজিযোগে রাজীব, সোহাগ ও মিঠু সোমাদের বাড়িতে যায়। পরে শাহাদাত, শামীম ও আশরাফুল আরেকটি সিএনজিতে ওই বাড়িতে যায়। এর আগে শামীম বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে। ভোর ৪টায় তারা সোমাদের বাড়িতে যায়। দরজায় নক করলে রাজীব দরজা খুলে দেয়। মিঠু, সোহাগ ভেতরে প্রবেশ করে। শামীম ও রাজীব সোফায় বসে থাকে। প্রথমে তারা রানার কক্ষে প্রবেশ করে। রানা এ সময় ঘুমাচ্ছিল। তখন মিঠু শামীমকে বলে তুই রানার দুই পা চেপে ধর, নইলে তোকেও দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিব। জীবন রক্ষার্থে শামীম রানার দুই পা চেপে ধরে। সোহাগ রানার বুকের ওপর বসে মুখ চেপে ধরে। মিঠু ছোরা দিয়ে রানাকে জবাই করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর রাজীব সোমার কক্ষের দরজা নক করে ভেতর থেকে পরিচয় জানতে চাইলে রাজীব বলে আপা আমি, দরজা খুলো। সোমা দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে মিঠু ও সোহাগ ভেতরে ঢুকে। এ সময় শামীম শাহাদাতের কক্ষে প্রবেশ করে। মিঠু ও সোহাগ ২০ মিনিটের মধ্যে সোমাকে জবাই করে কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে। হত্যার আগে বাঁচাও বাঁচাও বলে সোমা চিত্কার করেছিল। তখন শামীম ও রাজীব তার কক্ষের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। হত্যার পর মিঠু একটি টাকার ব্যাগ শামীমের হাতে তুলে দেয়। এ ব্যাগে ২০/ ২৫ লাখ টাকা ছিল। চিত্কার শুনে কাজের মেয়ে রেখা ছুটে আসে। এই মেয়েটিকে রানার কক্ষে নিয়ে সোহাগ ও মিঠু জবাই করে হত্যা করে। অপর কাজের মেয়ে মনি ঘটনা দেখে ফেলে। তাকেও খুনিরা রানার কক্ষে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেছে। দুই গৃহকর্মী খুনি, রাজীব ও শাহাদাতকে দেখে ফেলে। বেঁচে থাকলে তারা ঘটনা ফাঁস করে দিতে পারে এজন্য তাদেরও হত্যা করা হয় বলে জানান শামীম। টাকার ব্যাগটিও শামীম শাহাদাতকে দিয়ে দেন। সেখান থেকে শামীমকে ৫০ হাজার টাকা ও আশরাফুলকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে দেয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করে শামীম। ১৫ মে শামীমকে সোনারগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদারের নেতৃত্বে গ্রেফতার করা হয়। নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের এএসপি উত্তম প্রসাদ পাঠক ও এসআই পল্টু ঘোষ শামীমকে রাতভর শারীরিক নির্যাতন চালায়। থানা হেফাজতে শামীমকে হত্যা করার জন্য চেয়ারম্যান রফিক তার খালাতো ভাই সোবহানের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছে বলে শামীমের আত্মীয়-স্বজনরা অভিযোগ করেন। স্বজনদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা চেয়ারম্যান রফিক নিজেই। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে বড় ছেলে শাহাদাতকে দায়িত্ব দিয়ে তিনি বিদেশ চলে যান। খুনের পরপরই তিনি দেশে ফিরে আসেন বলে শামীমের পরিবার অভিযোগ করেছে। শামীমকে নির্যাতনকারী পুলিশ কর্মকর্তারা শামীমের ময়না তদন্ত রিপোর্ট গায়েব করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।