‘নদীর এ’কূল ভাঙ্গে, ও’কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা, সকাল বেলার ধনী যে ভাই, ফকির সন্ধ্যা বেলা ’- নদীমাতৃক বাংলাদেশে এ এক করুণ বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় মহানগরী ও শহরগুলোতে আজকাল ঠিকানাবিহীন যেসব ভাসমান বাসিন্দাদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, তাদের অনেকেই নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নি:স্ব হাতে শহরে এসে ভিড় করছেন। একদিনে হয়তো তাদের সুসজ্জিত বসতবাড়ি ছিল, বিরাট ফলের বাগান কিংবা বিস্তৃত ফসলের জমি ছিল। কিন্তু এখন সেসব কেবলই দীর্ঘশ্বাস। ভাঙ্গনপ্রবণ নদীর করাল গ্রাসে এ পর্যন্ত দেশের বহু জনপদ, শহর, বন্দর, বাজার ও সড়ক অবকাঠামো বিলীন হয়ে গেছে। আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হলে ভাঙ্গনের থাবা অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো আটকিয়ে দেয়া যেতো। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ-সংস্থানের অভাবে নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা কখনোই গ্রহণ করা যায় না।
নদী ভাঙ্গনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তরফ থেকে চলতি ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ২ হাজার ৬৫৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার সুনির্দিষ্ট চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল সরকারের কাছে। এর বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৩৬৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এই চিত্র কেবল চলতি অর্থ-বছরের নয়। প্রতি বছরই নদ-নদীর ভাঙ্গন রোধ, তথা ঘরবাড়ি হারানোর হুমকিতে থাকা হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ করার লক্ষ্যে যে পরিমাণ অর্থের চাহিদা উপস্থাপন করা হয়, তার বিপরীতে বরাদ্দ মেলে যত্সামান্য। এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাঙ্গনের মুখে থাকা বিস্তৃণ জনপদ, ফসলি জমি, বন্দর, যোগাযোগ অবকাঠামো ইত্যাদি রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কথা সবারই জানা যে, নদী ভাঙ্গন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, ভৌগলিক ও পরিবেশগত পটভূমিতে একটি চলমান সমস্যা। এই ভাঙ্গনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সদূরপ্রসারী। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই বন্যা-ভাঙ্গনের প্রাকৃতিক থাবা থেকে বাংলাদেশের মানুষের রেহাই পাওয়ার কোন উপায় নেই। ফ্ল্যাড অ্যাকশন প্ল্যান বা ফ্যাপের এক সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়। একই সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে, নদী ভাঙ্গনজনিত ক্ষতির শিকার হয় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ মিললেই এসব ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কাটিয়ে উঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মনিটরিং সেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাঙ্গনপ্রবণ নদী হলো যমুনা। এছাড়া মেঘনা, পদ্মা, তিস্তা, ধরলা, আত্রাই, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, কুশিয়ারা, খোয়াই, সুরমা, মনু, জুরী, সাঙ্গু, ধলাই, গোমতী, মাতামুহুরি, মধুমতি, সন্ধ্যা, বিশখালী ইত্যাদি নদীও যথেষ্ট ভাঙ্গনপ্রবণ। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৩০টি স্থানে উল্লেখযোগ্যভাবে নদী ভাঙ্গনের ঘটনা ঘটছে। এসব স্থানের ভাঙ্গন রোধে প্রতিবছরই পানি উন্নয়ন বোর্ডের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দ চেয়ে সরকারের কাছে চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপ্রতুল আর্থিক বরাদ্দের কারণে ভাঙ্গন রোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় সীমিত আর্থিক বরাদ্দের আলোকে বিশেষ বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ শহর, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, নদী ও সমুদ্র বন্দর, সমৃদ্ধ জনপদ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান ইত্যাদি রক্ষায় যতদূর সম্ভব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া আন্ত:সীমান্ত নদীসমূহের ভাঙ্গন রোধের মাধ্যমে দেশের মানচিত্র রক্ষা বা হারিয়ে যাওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের কাজটিও বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৫৯ সালে তত্কালীন পানি ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিগত ৫৪ বছরে নদী ভাঙ্গন রোধে সর্বমোট ৭৫১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যয় হয়েছে কমবেশি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে অনুসৃত স্বাভাবিক নিয়ম অনুসরণ করলেও এসব প্রকল্পের বিপরীতে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে প্রতিবছর ন্যূনতম ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এসব প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে পরিমাণ অর্থবরাদ্দ দেয়া হয়, তা খুবই সামান্য। এ কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর সুদূরপ্রসারী সুফল থেকে সংশ্লিষ্ট বিরাট জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাও সময়ের ব্যবধানে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ২০১০-১১ অর্থ-বছরে ১ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল মাত্র ৩০৫ কোটি ২ লাখ টাকা এবং পরের বছর ২০১১-১২ অর্থ-বছরে ২ হাজার ১৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিপরীতে দেয়া হয় মাত্র ৩১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। চাহিদার বিপরীতে অর্থের এমন স্বল্প বরাদ্দের কারণে কখনোই নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করা সম্ভব হয় না, তেমনি পুরনো প্রকল্পগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণও হচ্ছে না। এ অবস্থায় নদী ভাঙ্গনজনিত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ) প্রকৌশলী মো: মোজাফফর আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, নদী ভাঙ্গনজনিত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ইতিমধ্যেই অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙ্গন রোধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
