সিলেট নগরীসহ আশপাশের জেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সিলেটে কখন বিদ্যুত্ যায়, কখন আসে তার সঠিক হিসাব বুঝি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এই গরমে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। ‘এমনিতেই ঘন ঘন হরতালে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে, তার উপর আবার বিদ্যুতের জ্বালা’—এমন মন্তব্য করে জিন্দাবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সিলেটের গ্যাস দিয়ে সিলেটে যে পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পন্ন হয় সে সুবিধা থেকেও সিলেটবাসী বঞ্চিত।’
তবে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে এ অঞ্চলের বিদ্যুত্ ব্যবস্থার উন্নয়নে এক হাজার ৪৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন’ নামে চলমান প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ নির্বিঘ্ন হবে। আগামী ২০১৫ সালে এটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটি ২০১২ সালে শুরু ও ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সিলেটে ভূমি পাওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে এর কাজ-কর্ম পিছিয়ে পড়েছে।
বৃষ্টিবহুল সিলেটে একটু জোরে বাতাস বইলেই লোকজন বলাবলি শুরু করেন যে, এই বুঝি বিদ্যুত্ চলে যাবে- আর আসলে তাই হয়। পুনরায় বিদ্যুত্ আসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। গত বুধবার সন্ধ্যায় ঝড়ের পর নগরী বিদ্যুিবহীন ছিল ৮-১০ ঘণ্টা। সিলেটে বিদ্যুত্ বিভাগের অবকাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অনেকটা বিপাকে। জোড়াতালির বিদ্যুত্ লাইন, দুর্গম পাহাড়-টিলা, বনবনানী, চা-বাগানসহ নানা স্থাপনার উপর দিয়ে টানা বিদ্যুত্ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে।
প্রকৌশলীরা জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যুত্ বিপর্যয় ঘটে বেশি। ঝড়-বজ পাত, প্রচণ্ড বৃষ্টি হলে লাইন ট্রিপ করে, ট্রান্সফরমার বিকলসহ নানা কারণে বিদ্যুত্ বিভ্রাট ঘটে। ইদানীং প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের অভাবে রাতভর নির্ঘুম থাকতে হয়। প্রায় প্রতিদিন তিনটি ডিভিশনেই সংস্কার কাজ চলে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রেখে। তবুও যেন সংস্কার শেষ হয় না। বিদ্যুত্ চলে গেলে অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করে কাউকে পাওয়া যায় না। বিদ্যুতের সিলেটস্থ প্রধান প্রকৌশলী মুক্তিযোদ্ধা সোলেমান খান ইত্তেফাককে বলেন, সীমিত জনবল ও সম্পদ দিয়ে সহকর্মীদের নিয়ে সরবরাহ ঠিক রাখাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, সিস্টেম লস ১৬ দশমিক ৩০ ভাগে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ‘সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সার্বিক অবস্থার উন্নতি হবে।
সূত্র জানায়, বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলে ১ম ও ২য় শ্রেণির কর্মকর্তার অনুমোদিত পদ ১৩৪ এর মধ্যে ৫৯টি পদ শূন্য। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৯৫৪টি পদের মধ্যে ৪৯৭টি শূন্য আছে দীর্ঘদিন থেকে। অর্থাত্ কর্মকর্তা, কর্মচারী মিলে এক হাজার ৮৮ জনের মধ্যে ৫৫৬টি পদ শূন্য।
সিলেট অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারিভাবে মোট ৭৪০ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে গ্রীষ্মকালে সিলেটের চাহিদা ৩২০-৩৩০ মেগাওয়াট। শীতকালে চাহিদা ২১০-২২৫ মেগাওয়াট। অবশিষ্ট বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন প্রকল্প
বৃহত্তর সিলেটের চার জেলা ও ময়মনসিংহের বিদ্যুত্ ব্যবস্থার উন্নয়ন লক্ষ্যে প্রকল্পটি সরকার হাতে নেয়। উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি চলমান। প্রকল্প ব্যয় প্রথমদিকে ৯৮৫ কোটি টাকা ছিল। পরে কাজের পরিধি বৃদ্ধিসহ নানা কারণে ব্যয় বেড়ে এক হাজার ৪৪১ কোটিতে উন্নীত হয়। প্রকল্পের প্রজেক্ট ডাইরেক্টর মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় ভোগান্তি অনেক কমে যাবে।’
মৌলভীবাজারের শাহ মোস্তফা রোডে সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চললেও সিলেটের এমসি কলেজ এলাকায় ও দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় কাজ আগাচ্ছে না।
