ফলন ভালো বোরোর, কিন্তু দাম পেল না কৃষক

আপডেট : ১০ জুন ২০১৩, ২২:৫৬
কৃষককে বোরোর ন্যায্যমূল্য দিতে সরকারের আগাম সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা কোন কাজে আসল না। ফলন ভালো, কিন্তু এবারও বোরোর দাম পেল না তারা। ন্যায্যমূল্য দূরের কথা, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণ ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা। এ নিয়ে পর পর তিন বছর লোকসান গুনলো কৃষক। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে লোকসান গুনে কৃষক কতদিন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে কাজ করবে? দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে খাদ্যশস্যের ভান্ডারখ্যাত উত্তরাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারো বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। সারাদেশে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বোরো চাষ হয়েছে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে। আশা করা হচ্ছে, ২ কোটি টন ধান উত্পাদন হবে। কিন্তু যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে যাচ্ছে সেই কৃষকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। কষ্টার্জিত ফসল বিক্রি করে লোকসানই গুনতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে দেশের হাট-বাজারগুলোতে গড়ে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ থেকে ৫৫০ টাকায়। মৌসুমের শুরুতে ৪৩০ থেকে ৪৮০ টাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছে। তারপরও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি মণ ধানে কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১২৮ থেকে ১৪৮ টাকা। সরকারি হিসেবেই প্রতি মণ বোরো ধানে উত্পাদন খরচ ৬৭৮ টাকা। ধান কেনা হয়নি কৃষকের কাছ থেকে প্রতি বছর বোরো ধান হাট-বাজারে ওঠার পর সরকার সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করে। এবার ধান ক্ষেতে থাকতেই মূল্য ও কি পরিমাণ ধান সংগ্রহ করবে তা ঘোষণা করেছে যাতে কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়। কিন্তু আগাম সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা কাজে আসেনি। এছাড়া সংগ্রহ নীতিমালায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি এমনকি নির্দিষ্ট সময়ে ১ মে থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুও হয়নি। ফলে ধান চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের হাতে। তারাই এখন সরকারের গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করছেন। আবাদ কমেছে সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে কৃষক। ইতিমধ্যে তারা অন্য ফসল চাষে ঝুঁকছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, গত দুই বছরে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের আবাদ কমেছে সোয়া দুই লাখ হেক্টরে। এসব জমিতে তারা ধানের বদলে গম, ভুট্টা, আলু, সবজি, সরিষা ইত্যাদি চাষ করছেন। ২০১০-১১-এর তুলনায় চলতি ১২-১৩ অর্থবছরে ভুট্টার আবাদ বেড়েছে ৮৫ হাজার, গম ৬৯ হাজার, পিঁয়াজ ৮ হাজার ও শাক-সবজি ৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে। রায়গঞ্জে বোরো আবাদে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক চাষি রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন কম ও ধানের উপযুক্ত মূল্য না থাকায় চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রায়গঞ্জের প্রান্তিক চাষিরা। উত্পাদন খরচের সাথে বাজারমূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় ধার-দেনা করে দেহের ঘাম ঝরিয়ে আবাদ করেও লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের তেলিজানা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম জানান, তিনি মোট ৫ বিঘা জমিতে ব্রিধান-২৮, ২৯ ও হাইব্রিড হিরা ধানের আবাদ করেছিলেন। ফলন ভাল হলেও ধান বিক্রি করতে হয়েছে পানির দামে। ৪৩০ টাকা থেকে ৪৮০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে বিঘাপ্রতি প্রায় ১ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। চান্দাইকোনা ইউনিয়নের বল্লাভেংকুর গ্রামের জোতদার কৃষক সানোয়ার হোসেন তালুকদার জানান, তিনি নিজে সাড়ে ১৩ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে এবার ক্ষতি হয়েছে। ফলে বিঘাপ্রতি গড় ফলন হয়েছে প্রায় ১৬ মণ । প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ না হলে গড় ফলন বিঘাপ্রতি হতো ২০-২২ মণ। তাতে এতবেশি লোকসান হতো না। তিনি বলেন, এই লোকসান কৃষকের হবে না যদি তারা সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ দিয়ে সরকার ঘোষিত ক্রয়মূল্য পায়। পাশাপাশি সার, বীজ, ওষুধসহ চাষাবাদের সকল উপকরণের মূল্য হ্রাস করা হলে কৃষকদের এমন হা-হুতাশ করতে হবে না। তিনি বলেন, বিদ্যুত্ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় দেয়ায় কৃষকের কোন লাভ হয়নি। লাভ হয়েছে সেচ প্রকল্পের লোকদের। ২০ শতাংশ হারে বিদ্যুত্ বিলে ছাড় দিতে গিয়ে সরকারকে যে অংকের অর্থ ভর্তুকি দিতে হয় সেই অংকের ভর্তুকি কৃষি উপকরণে দিলে কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবে।