‘ঐ দেখা যায় তালগাছ/ ঐ আমাদের গাঁ/ ঐ খানেতে বাস করে/ কানা বগীর ছা/ ও বগী তুই খাস কি/ পান্তাভাত চাস কি/ পান্তা আমি খাই না/ পুঁটিমাছ পাই না/ একটা যদি পাই/ অমনি ধরে গাপুস-গুপুস খাই।
এই জনপ্রিয় ছড়াটির রচয়িতা কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন।
কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন জন্ম গ্রহণ করেন ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানার গিরি গ্রামে। তার বাবার নাম মুহম্মদ মমরেজ উদ্দীন খান ও মায়ের নাম রাকিবুন নেসা খানম। পিতা-মাতার চার ছেলে দু’মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম সন্তান। মঈনুদ্দীন ছোটবেলায় দেখতে ছিলেন নাদুশনুদুশ ধবধবে সুন্দর। মা-বাবা আদর করে ডাকতেন ‘হিরু মিয়া’ নামে। মঈনুদ্দীনের বাবা মমরেজ উদ্দীন নিজ গ্রামের একটি পাঠশালায় শিক্ষকতা করতেন। বাবার কাছে এই পাঠশালায় মঈনুদ্দীনের লেখাপড়ার হাতে খড়ি। মঈনুদ্দীন পড়াশোনায় ছিলেন খুবই মনোযোগী। কিন্তু ভাগ্যের এমনি নিদারুণ পরিহাস যে, মাত্র নয় বত্সর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। মাতৃছায়া থেকে বঞ্চিত হয়ে বাবার স্নেহ মমতায় লালিত পালিত হতে থাকেন মঈনুদ্দীন। বিধি বাম। বারো বছর বয়সে তার বাবাও তাকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন পরপারে।
মা-বাবার মৃত্যুতে সংসারে নেমে আসে দুঃখের অমানিশা। দুঃখের অমানিশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে লাগলেন বালক মঈনুদ্দীন। সত্যি একদিন গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমালেন সুখনগরী কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে তিনি নিজ গ্রামের জনৈক এক ব্যক্তির বুক বাইন্ডিং কারখানায় নিলেন আশ্রয়। তারপর এই কারখানায় তিনি একজন ক্ষুদে কর্মচারী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন বই বাঁধাই কাজে।
ছোটবেলায় বই পড়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল মঈনুদ্দীনের। নতুন বইয়ের গন্ধে আর ছড়ার ছন্দ ঝংকারে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠতেন। এবার কলকাতায় এসে তিনি নিজ হাতে বই বাঁধই করে সারি সারিভাবে সাজিয়ে রাখেন সারা ঘর ভরে। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বইয়ের পাতা খুলে চোখ বুলান, গন্ধ শুকেন। নতুন বইয়ের গন্ধে মন আনন্দে ভরে ওঠে।
লেখাপড়ার প্রতি মঈনুদ্দীনের ছিল আশৈশব বাসনা। বইয়ের নতুন নতুন ছড়া-কবিতার ছন্দ দোলা দেয় তাঁর কচি মনে। তিনি নিজেই বর্ণে বর্ণে গাঁথেন বর্ণমালা। চুপি চুপি লিখতে লাগলেন ছোট ছোট ছড়া-কবিতা।
মঈনুদ্দীন একাকী মনে ভাবতে লাগলেন কবি হতে হলে ভাল লেখাপড়ার প্রয়োজন। সেই চিন্তা মনে পোষণ করে ভর্তি হলেন নৈশ বিদ্যালয়ে। দিনে কারখানার কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন আর রাতের বেলায় বই হাতে স্কুলে পড়তে যান। এই সময় বালক কবি মঈনুদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় হয় একই মহল্লার ছাত্র খন্দকার আবদুল মজিদ নামে এক ছেলের সঙ্গে। আবদুল মজিদ তিনিও ছিলেন একজন সাহিত্য সেবক। সাহিত্য নিয়ে আলাপ আলোচনায় একসময় দু’জন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। দু’বন্ধু মিলে রাত জেগে হাতে লিখে প্রকাশ করেন ‘মুসাফির’ নামে একটি দেয়াল পত্রিকা। এই দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের পর মঈনুদ্দীন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তারপর তিনি তার লেখা পাঠাতে লাগলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। ১৯২১ সালে তার লেখা ‘খোদার দান’ নামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয় মাসিক ‘সহচর’ পত্রিকায়। পত্রিকার পাতায় ছাপাক্ষরে নিজের নাম দেখে কিশোর কবি আনন্দে হয়ে পড়েন আত্মহারা এবং সাহিত্য সাধনায় একাগ্রচিত্তে নিমগ্ন হন। তারপর তিনি নিজেই প্রকাশ করেন তার লেখা ‘উচিত্ কথা’ নামে ছোট্ট একটি কবিতার বই।
কবি মঈনুদ্দীন নিবিষ্ট মনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখতে থাকেন এবং কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা করে পরিচিত হয়ে স্নেহ-ধন্য হন। এমনিভাবে একদিন দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকা অফিসে গিয়ে বিদ্রোহী কবি নজরুলের সঙ্গে দেখা করে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হন মঈনুদ্দীন। নজরুলের কাছে পেলেন তিনি অনুপ্রেরণা। প্রথম দেখেই নজরুলের কথা-বার্তা, চলন-বলন, পোশাক-আশাক সবকিছুই ভাল লাগে মঈনুদ্দীনের। কবি নজরুলকে ভালবেসে অনুকরণ করতে লাগলেন মঈনুদ্দীন। শুধু নজরুলের ব্যবহারিক বিষয়বস্তু অনুকরণ করেননি, মঈনুদ্দীন তার লেখালেখির বিষয়-আশয়ও নজরুলকে অনুসরণ করে লিখতে শুরু করেন। নজরুল ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীর্ষক কবিতা লিখে জেলে গেলেন। মঈনুদ্দীনও নজরুলের অনুরূপ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে ‘মুসলিম জগত’ পত্রিকায় আগুনঝরা ‘বিদ্রোহ’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে গেলেন জেলে। লেখাটি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিতে আপত্তিকর হওয়ায় তাকে ছ’মাসের কারাদণ্ড দিয়ে হুগলি জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই সময় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হুগলি জেলে ছিলেন অন্তরীণ। জেলে অন্তরীণ থাকাবস্থায় তাঁদের দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও নিবিড় হয়। নজরুল সান্নিধ্যে মঈনুদ্দীন হয়ে ছিলেন স্নেহধন্য। নজরুলের স্নেহসিক্ত হয়ে তিনি লিখেছেন ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’।
কবি মঈনুদ্দীন ছোটবেলা থেকে ব্যাপৃত ছিলেন জীবন সংগ্রামে। তার একাগ্রসাধনা, অধ্যবসায় ফলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একের পর এক সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হন। মঈনুদ্দীন নৈশ বিদ্যালয় থেকে পাস করে কলকাতা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা করপোরেশন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়াতে গিয়ে অনুভব করলেন যে, ‘বড়দের জন্য লেখা সহজ, পাঠদান করাও সহজ। কিন্তু ছোটদের বিশেষ করে শিশুদের জন্য লেখা বা তাদের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত কঠিন।’ শিশুদের মন-মানসিকতার উত্কর্ষতায় কি ভাবে একজন শিশুকে ভবিষ্যতে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, এই চিন্তা-ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে সরলমনা শিশুদের জন্য সহজ-সুন্দর কথার মালা গেঁথে যুক্তাক্ষর বর্জিত মনোনিবেশ হন সুপঠিত সাহিত্য রচনায়।
তিনি ছোটদের মননশীলতায় আত্মনিয়োগ করে লিখেন- ‘বাংলা প্রথম ভাগ, ঝিলমিল, সবুজ সাথী’ নামে পাঠ্যপুস্তক। এছাড়া আরও লিখলেন: বাবা আদম, আমাদের নবী, খোলাফায়ে রাশেদীন, ঝুমকো লতা, লাল মোরগ, ডাঃ শফিকের মোটর’ নামে- অনবদ্য শিশু সাহিত্যমালা। শিশুদের নিয়ে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য কবি মঈনুদ্দীনকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পুরস্কার প্রদান করে বাংলা একাডেমী। এছাড়াও একই বছরে ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ইউনেস্কো পুরস্কার। ১৯৭৪ সালে নজরুল একাডেমী পুরস্কার ও ১৯৭৮ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন।
শিশুসাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের লেখাগুলো খুবই সহজ সরল মনোমুগ্ধকর। তার যে কোন লেখা সরলমতি শিশুমনে সহজেই দাগ কাটে। ফলে যে কোন শিশু মুখে মুখে আবৃত্তি করতে আনন্দ উপভোগ করে।
কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন সারা জীবন শিশুদের মনোভূমি উত্কর্ষতার জন্য নিরলস ভাবে সাহিত্য সাধনায় ছিলেন নিয়োজিত। এই যুগস্রষ্টা শিশু সাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তার সকল ভাবনা, সকল চিন্তা, সকল সাহিত্যকর্মের অবসান ঘটিয়ে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই সুন্দর মায়াময় পৃথিবী থেকে নিয়েছেন চির বিদায়।
শিশু সাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন এই নশ্বর পৃথিবী থেকে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তার শিশুতোষ অমর সাহিত্যে অবদানের জন্য আমাদের হূদয়ে চির অমর হয়ে রয়েছেন।
