লোভের আগুনে পুড়ছে রাজধানীবাসীর স্বপ্ন

আপডেট : ১১ জুন ২০১৩, ২১:২২
রাজধানী থেকে ক্রমান্বয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে ভাবা হয় ওয়ারিকে। পাকিস্তান আমলে গড়ে তোলা হয় ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা। আদর্শ শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পঞ্চাশের দশকে রাজধানীর যেসব এলাকা আবাসিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, ধানমণ্ডি তার অন্যতম। পরবর্তী সময়ে গুলশান, বনানী, বারিধারাকেও আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, এসব এলাকা এখন আবাসিক হিসেবে চিহ্নিত করার উপায় নেই। প্রতিটি আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন স্থাপন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে শিল্প-কারখানাও। ঢাকা শহরজুড়েই এখন বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য চলছে। যে কারণে গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিসহ আবাসিক এলাকা তার নিজস্ব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। স্বাধীনতার পর গুলশান, বনানী ও বারিধারাসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে। ডিআইটির পক্ষ থেকে গড়ে ওঠা এসব আবাসিক এলাকার প্লট যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা তাঁদের বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট শুধু আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক এলাকায় যথেচ্ছভাবে গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। নজরদারির কেউ না থাকায় সরকারিভাবে গড়ে ওঠা প্রতিটি আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হচ্ছে। নামে আবাসিক এলাকা হলেও বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে কথিত আবাসিক এলাকার পার্থক্য খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক এলাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও কেউই তা পাত্তা দিচ্ছে না। এক সময় রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমার মূল কেন্দ্র ছিল মতিঝিল-দিলকুশা এলাকা। কালের বিবর্তনে গুলশান এখন সে স্থান দখল করেছে। এমনকি বিদেশিদের কাছেও এটি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিলাসবহুল হোটেল, গেস্টহাউজ, বায়িং হাউস, ট্রাভেল এজেন্সি, জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, বিপণি বিতান, রেস্তোরাঁ, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতালের কারণে গুলশানকে এখন আবাসিক এলাকা হিসেবে ভাবাই কঠিন হয়ে পড়েছে। চিহ্নিত আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক এলাকার রূপ ধারণ করায় ভয়াবহ যানজটের শিকার হচ্ছে ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকা। উচ্চ আদালত গত বছরের ১১ জুন ধানমণ্ডি এলাকা থেকে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তিন বছরের মধ্যে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এর আগে ২০০৯ ও ২০০১ সালে একই ধরনের নির্দেশনা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশবান্ধব রাজধানী গড়ে তোলার স্বপ্ন আজ অবধি পূরণ হয়নি। কিন্তু এই রাজধানীকে আমরা তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলতে চাই। দিনে দিনে নগরীর পরিধি বাড়লেও পরিকল্পনার অভাব এখনো প্রকটভাবেই দৃশ্যমান। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও মানুষের লোভের আগুনে পুড়ছে রাজধানীবাসীর স্বপ্ন। অন্যদিকে হাজারিবাগের ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য শুধু ওই এলাকারই নয়, ঢাকা এবং এর আশপাশের পরিবেশও বিষাক্ত করছে। হাজারিবাগের ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অনেকদিন থেকেই সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এখানেও উদ্যোক্তাদের নানা অজুহাত। রাজধানীর আবাসিক এলাকাতেই একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ শিল্প-কারখানা। নগরবাসী আবাসিক এলাকায় শিল্প-কারখানার অবাধ বিস্তারে অসহায়। ফলে বাধ্য হয়েই নগরবাসীর অনেককেই কারখানা ভবনে কিংবা এর আশপাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হচ্ছে। এতে শব্দ দূষণসহ নানা ধরনের দূষণের শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। রাজধানীর পুরনো ঢাকার লালবাগ, হাজারিবাগ, ইসলামবাগ, বংশাল, কোতোয়ালি, চকবাজার, যাত্রাবাড়ি, কামরাঙ্গিরচর, শ্যামপুর, সূত্রাপুর, কদমতলী, পোস্তগোলা, ধোলাইখাল, ফরিদাবাদ, ইসলামপুর, ধোলাইখাল, বড় কাটরা, সোয়ারিঘাট ও পোস্তাসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে বহু বছর ধরেই হাজার হাজার শিল্প-কারখানা চালু রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব শিল্প-কারখানা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিও বটে। কারণ এসব শিল্প-কারখানায় ব্যাটারি ঢালাই, ওষুধসামগ্রী, পলিথিন ব্যাগ, পলিথিনের দানা, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক পাখা ও তার, আচার, চকোলেট এবং বিস্কুটসহ নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে বিপুলসংখ্যক ঝালাই কেমিক্যাল, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, নানা ধরনের সুগন্ধি ও আতর, আতশবাজি, পটকা, সাইকেল, নাটবল্টু, খেলনা, প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানা। একইসঙ্গে নকল প্রসাধনী সামগ্রী, বিভিন্ন ধরনের গহনা, জুতা, স্যান্ডেল, রাবার, রং, সলিউশন, ব্লিচিং পাউডার, ওয়াশিং সামগ্রী ও ভিসিডি প্লেয়ারসহ আরো অনেক পণ্য তৈরির কারখানাও রয়েছে এসব এলাকায়। প্রকাশ্যেই চালু থাকছে এসব অবৈধ শিল্প-কারখানা। প্রশাসন জানলেও রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ! ব্যবস্থা গ্রহণে তেমন কোনো মাথাব্যথাই নেই তাদের! অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের লোকজন আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এসব অবৈধ কারখানা থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছে। এজন্য এলাকাবাসী বাধা দিলেও কেউ তা শুনছে না। বরং এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা শিল্প-কারখানা পরিচালিত হচ্ছে পেশীশক্তির মাধ্যমে। আর তাদেরকে আড়ালে সহায়তা করছে পুলিশ প্রশাসন। ফলে ভুক্তভোগীদের কোনো অভিযোগ আমলে নেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে এর পরিবেশ বদলে দিতে হবে। রাজধানীর বাতাসে এখন বিষ। খালগুলো মরে গেছে, দখল হয়ে গেছে। বিষাক্ত বর্জ্য রাজধানীর পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। একদিকে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য রাজধানীর পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। অন্যদিকে পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামগুলো আবাসিক এলাকায় বড়ো ধরনের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় রাসায়নিকের গুদাম ও ট্যানারি ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই। রাজধানীকে বাসযোগ্য করার স্বার্থে এটা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমি মনে করি সুষ্ঠু নগরায়নের স্বার্থে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা দরকার। কোনো অজুহাতে তা নষ্ট হতে দেওয়া অপরাধের শামিল। জনগণ আশা করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। যাঁরা আইন ভঙ্গ করে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে রাজউকের যেসব কর্মকর্তা বেআইনিভাবে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমোদন দিয়েছেন, তাঁদের শাস্তিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকা