সিটি নির্বাচন নিয়ে স্নায়ুচাপে ইসি

আপডেট : ১১ জুন ২০১৩, ২২:৪৬
পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে স্নায়ুর চাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তারাও আছেন নানা চাপে। ভোটগ্রহণের দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে দুশ্চিতায় পড়েছে কমিশন। এ পরিস্থিতিতে ফের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদেরকে আজ বুধবার কমিশনের বৈঠকে ডাকা হয়েছে। বৈঠকে ভোটকেন্দ্র ও ভোটারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কৌশল নির্ধারণ করা হবে। ইতিমধ্যে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনে আরো বেশি সংখ্যক ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খুলনা ও রাজশাহীকে স্পর্শকাতর নির্বাচনী এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ খুলনা সফর করে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এ নির্বাচনকে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছি। নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করতে যাচ্ছে ইসি। ১৫ জুন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটির এবং ৬ জুলাই গাজীপুর সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নানা কারণে জাতীয় রাজনীতিতে এই সিটি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্দলীয় হলেও পুরো দলীয় আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি এখনো এই নির্বাচন কমিশনকে মেনে নেয়নি। এই কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদের কোন উপ-নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। কিন্তু সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কৌশলী আচরণ করছে। বিএনপি বলছে, বর্তমান কমিশনের অধীনে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না এবং কমিশনের উপর তাদের আস্থা নেই। আবার গত সোমবার বিএনপির একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে নানা অভিযোগ করেছে। যদিও কমিশনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রতিনিধি দলের নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা দলীয়ভাবে এখানে আসেননি। বিএনপি নেতারা তাদের বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে কমিশনের সমালোচনাও করে যাচ্ছেন। বিরোধী দলের এই আস্থা-অনাস্থার বিষয়টি মাথায় রেখেই কমিশন পাঁচ সিটি নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোটকেন্দ্র এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। এ বিষয় নিয়ে ইতিপূর্বে কমিশন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সকল প্রধানকে নিয়ে একটি বৈঠকও করেছিল। সাধারণত কোন নির্বাচনের আগে এ ধরনের বৈঠক একবারই হয়ে থাকে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে কমিশন আজ পুনরায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কমিশনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে বহু অভিযোগ জমা পড়েছে। কিছু কিছু স্থানে পুলিশ রদবদলও করা হয়েছে। আজকের বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সতর্ক করে দেয়ার পাশাপাশি কোন ধরনের পক্ষপাত না করার জন্য আহবান জানানো হবে। এছাড়া পুলিশের বিকল্প হিসাবে র্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি ও কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হচ্ছে। এসব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তারা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল কমিশন বৈঠক করে চার সিটিতে চারজন কমিশনারকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারককে খুলনা, মোহাম্মদ আবু হাফিজকে রাজশাহী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলীকে বরিশাল ও মো. শাহ নেওয়াজকে সিলেট সিটি করপোরেশনে দায়িত দেয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনারদের কাছে প্রতিদিনের পরিস্থিতি জানাতে এবং তাদের কাছ থেকে নির্দেশনা নিতে সংশ্লিষ্ট সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য কমিশনের পাঁচ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিব আতিয়ার রহমানকে খুলনা, সহকারী সচিব মিজানুর রহমানকে বরিশাল, সহকারী পরিচালক আরাফাত আরাকে সিলেট, সহকারী সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুল হককে গাজীপুর ও নির্বাচন কর্মকর্তা আশফাকুর রহমানকে রাজশাহীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ওয়েব ক্যামেরা বসানো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে। চার সিটির মধ্যে রাজশাহী ও খুলনা সিটি নির্বাচনী এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ইসির সঙ্গে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর এবং ছাত্রশিবির অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এটি অন্য যেকোন সিটির তুলনায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, গত ৮টি নির্বাচনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে সবসময়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে ওইসব এলাকায় ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীরা অবস্থান করছেন। আর সর্বহারা অধ্যুষিত হওয়ায় খুলনা সিটিও ঝুঁকিপূর্ণ। আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বিগত বৈঠকে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা আশংকা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিরোধী দল গোলমাল পাকাতে পারে। এ নিয়ে ভোটের পরে বড় ধরনের সহিংসতাও হতে পারে।’ এসব কারণে এ সিটি নির্বাচন রাজনীতির একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে দেখা দিয়েছে। বিরোধী দল নির্বাচনে হারলে বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়—এমন কথা বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে সরকারি দল পরাজিত হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দু’পক্ষই বিজয়ী হতে মরিয়া। দু’দলের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় পরিসরের এই নির্বাচন আয়োজন নিয়ে স্নায়ু চাপে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কমিশন থেকে রিটার্নিং অফিসারদের বার বার বলা হয়েছে আচরণবিধি লংঘনের প্রমাণ পেলে ছাড় না দিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে। কোন প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পক্ষ থেকে দেয়া বা ব্যক্তিগত অভিযোগ ছাড়াও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’