হত্যা মামলা তদন্ত অনেক ঝামেলার। ছিনতাই ডাকাতি মামলা নোংরা মামলা। গাড়ি চুরি মামলা মোটামুটি, যদি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আর অস্ত্র মামলা খুনের মামলার মতোই। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে হল স্বর্ণ-মুদ্রা ও চোরাচালানী মামলা। কারণ এসব মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে দৌড়ঝাপ কম করতে হয়, ‘উপঢৌকন’ পাওয়াটাও প্রায় নিশ্চিত থাকে। তাই ‘মধু’ বেশি বলেই তদন্ত করা নিয়ে রীতিমত চলে প্রতিযোগিতা। কথাগুলো খোদ পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার।
গত এক বছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যতগুলো স্বর্ণ, মুদ্রা বা চোরাচালান মামলা হয়েছে তার সিংহভাগ মামলার তদন্ত গ্রহণ করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডি। তবে দীর্ঘদিনেও রহস্য জনক কারণে অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। প্রত্যেকটি মামলার শুরুতে গোয়েন্দারা ব্যাপক লম্ফজম্প দেখালে পরবর্তীতে মামলার তদন্ত চলে গেছে হিমাগারে (!)। সর্বশেষ গত ৯ জুন শাহজালাল বিমানবন্দরে দেড় কেজি ওজনের স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা আটকের মামলাটির তদন্ত গ্রহণ করে সিআইডি। তবে এ আটকৃত স্বর্ণ ও মুদ্রা আটক করেছিল এপিবিএন।
সূত্র জানায়, স্বর্ণ আটক মামলার অধিকাংশ ঘটনায় বাদী হয়ে থাকে উদ্ধারকারী সংস্থা। হয় কাস্টমস, এপিবিএন অথবা থানা পুলিশ। কিন্তু সর্বশেষ মামলাটি বাদি হয়েছে সিআইডি। মামলাটির তদন্তও তারাই করছে। এরআগের সব মামলার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে মামলা দায়েরের পরপরই থানা পুলিশের কাছ থেকে মামলা নিয়ে গেছে অন্য সংস্থায়। এমনকি তদন্ত শেষ হওয়া মামলাও থানা থেকে নিয়ে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তবে প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত ঝুলে আছে। গ্রেফতারকৃতরা আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক আব্দুল্লাহ আরেফ জানান, চোরাচালানীদের ধরার ব্যাপারে এপিবিএন-এর সাফল্য অনেক। কিন্তু এপিবিএন-এর তদন্ত ক্ষমতা নেই বিধায় মামলার তদন্ত সিআইডি অথবা ডিবি করছে।
বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সামছুউদ্দিন সালেহ আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার সময় বিমানবন্দরে যতগুলো স্বর্ণ বা মুদ্রা আটকের ঘটনায় মামলা হয়েছে তার সিংহভাগই তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আর দেড় কেজি স্বর্ণ আটকের মামলার বাদী হয়েছেন সিআইডির একজন পরির্দশক। তিনি আরও বলেন, মামলায় যে কোন সংস্থার লোকই বাদী হতে পারে। আর মামলার তদন্ত নিয়ে কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই।
দেড় কেজি স্বর্ণ আটক মামলা ঃ গত শনিবার রাতে দেড় কেজি স্বর্ণ ও ৫০ হাজার টাকার বৈদেশিক মুদ্রাসহ গ্রেফতার হন সিঙ্গাপুর থেকে আসা যাত্রী গোলাম রব্বানী। গ্রীন চ্যানেল দিয়ে বের হওয়ার সময় এপিবিএন-এর সদস্যরা তাকে আটক করে। সূত্র জানায়, কুমিল্লার মুরাদনগর থানার মোচাগড়া গ্রামের আলী আজগরের ছেলে গোলাম রব্বানি। তিনি আগেও বেশ কয়েকবার বিভিন্ন দেশে থেকে স্বর্ণসহ অন্যান্য মালামাল এনেছেন। তিনি মূলত একজন ক্যারিয়ার। ঘটনার সময় তার সঙ্গে থাকা একজন এপিবিএনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দ্রুত বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত গোলাম রব্বানিকে জিজ্ঞাসাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। স্বর্ণ আটকের ঘটনায় আর কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। গোলাম রব্বানীর কাছ থেকে নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
৭ ও ১৪ কেজি স্বর্ণ আটক মামলা ঃ গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এপিবিএন আটক করেছিল ১৪ কেজি স্বর্ণসহ যাত্রী মনোয়ারুল হককে। ঐ ঘটনায় এবিপিএন-এর সাব-ইন্সপেক্টর নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। গ্রেফতার হয় পুরনো ঢাকার একজন ট্রাভেলস মালিক। কিন্তু তদন্তের মাঝপথে মামলার তদন্ত চলে যায় মহানগর গোয়েন্দাদের কাছে। প্রথম দিকে এনিয়ে গোয়েন্দারা ব্যাপক সফলতার কথা বললেও আজ অবধি মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। গত জানুয়ারি মাসে এপিবিএন আটক করে ৭ কেজি স্বর্ণ। তবে মামলার বাদী করা হয়েছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলমকে। গ্রেফতার করা হয়েছিল তিন জনকে। কিন্তু ঐ মামলাটিরও তদন্ত শেষ হয়নি।
