খেলাধুলাই যার প্রাণ

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৩, ১৯:৫৫
ধরুন গোটা চল্লিশেক মেডেল ঝুলিয়ে দেওয়া হলো আপনার গলায়! সেটা সামাল দিতেই তো হিমশিম খাওয়ার কথা। আজ যার কথা বলছি তিনি অবশ্য এসব সামলে নিয়েছেন অবলীলায়। খুব ছেলেবেলা থেকেই খেলার প্রতি আগ্রহ জন্মে, যেটা আর দশজনের মতো কেবল খেলার খাতিরে খেলা নয়। তিনি চাইতেন যেটাই খেলবেন, তাকে সেরা হওয়া চাই। আর দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু এ যে মেঘ না চাইতেই জল, তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন ক্যাডেট কলেজে। খেলার সাথে সাথে শৃংখলময় জীবন গড়ার হাতছানি। রংপুর ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন এই মেধাবী শিক্ষার্থী স্মরন মুহাইমিন ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, ক্রিকেটসহ গেন কিছু নেই যাতে পুরস্কার পাননি। তার খেলার জগত্ আর তরুন প্রজন্মের প্রতি ভাবনা নিয়ে এবারের অন্যতারুন্য, সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র স্মরণের খেলাধুলার পেছনে বন্ধু আর পরিবারের অনুপ্রেরণা সবসময়ই ছিল। সেই সাথে নিজের আত্মপ্রত্যয়ের কমতি ছিল না কখনও। সবগুলো ক্যাডেট কলেজ একসাথে ফুটবলের মাঠে নেমেছে যখন, তখনও স্মরণের নিপুণ পায়ের কৌশলে অভিভূত হয়েছে সবাই। খেলার সময়ে এই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি, সেই সাথে যেকোনো খেলায় ভালো করতে দরকার নিয়মিত প্র্যাকটিস। একাগ্রতা আর অনুশীলনই খেলার মাঠে একজনকে শিরোপার পথ দেখিয়ে দেয়। দেশ-বিদেশের নানা খেলাও দেখা চাই সেরা হতে চাইলে। আন্তর্জাতিক বা ক্লাবের যেই খেলাই হোক না কেন, স্মরণকে কখনও আটকে রাখা যেত না। বন্ধুদের সাথে অথবা পরিবারের সাথেই হৈচৈ করে খেলা দেখতে পছন্দ করেন তিনি। পর্যবেক্ষণ যে শেখার অনেক বড় মাধ্যম সেটা খেলাধূলার ক্ষেত্রেও খাপ খাইয়ে যায় একদম। প্রাইমারী স্কুলে একবার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছে! কয়েকজন খেলায় অংশ নিতেই চাইল না। কারন খোঁজ করে জানা গেল, এমন একজন খেলতে নামছে যে থাকলে কিনা তাদের আর পুরষ্কার পাওয়ার চান্স থাকল না। সেই ছেলেটাই আজকের স্মরন মুহাইমিন।যেই খেলাতেই অংশ নিত, প্রথম পুরষ্কার তার দখলে। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক খেলাতে অংসগ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। আর সেগুলোর দলনেতা সেই থাকত। কি সিনিয়র কি জুনিয়র? স্মরনের উপর দায়িত্ব দিয়েই যেন সবাই সন্তুষ্ট থাকত। একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, শুরুর দিকে পাড়ায় ক্রিকেট খেলা দিয়েই শুরু। কখনো বা হাফ সেঞ্চুরী করে পাচ টাকা জিতে নেওয়ার গৌরব অর্জন কখনও বা ফুটবল খেলে তিন নম্বর একটা বল পাওয়া, সবকিছুই তাকে অনুপ্রেরনা জুগিয়ে এসেছে সবসময়। স্মরনের খেলাধুলায় দারুন আগ্রহ দেখে বাবা-মাই চেয়েছিলেন বিকেএসপি তে ভর্তি করে দেবেন ছেলেকে। সেই সাথে চলছিল ক্যাডেটে ভর্তি করানোর জন্য প্রস্তুতি। আর এখানেই জানিয়ে দেওয়া দরকার, ছেলেটা যতুই খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকুক, পড়াশোনায় কখনও হেলাফেলা করেনি। কঠোর প্রতিযোগিতায় রংপুর ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়েই সে প্রমান করে পড়াশোনাতেও তাকে হার মানানো ভার। আর যেদিন কলেজে প্রথমদিন গেলেন, বলাই বাহুল্য সেখানে নানান রকম আধুনিক খেলার সরঞ্জাম থাকত । সেটা দেখে স্মরন আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য। আর ক্লাস শুরর করার পর তো তাকে আর পায় কে? বিকালের সীমিত পয়তাল্লিশ মিনিট খেলার সময়ে তার মন ভরে না কখনোই। কখনও ফুটবল কখনও বা ক্রিকেটের মাঠে মাতিয়ে রাখত সে। আর যদি আউটডোরে সুযোগ না তাহকে তো কি? ইনডোরে তাকে দেকাহ যাবে টেবিল টেনিসের ব্যাট হাতে হয়তো। আর এই সময়েই স্মরন তার খেলাধুলার সময়ের অনেক পুরষ্কার জিতে নেয়। তার ঝুলিতে ক্যাডেট কলেজের সময়েই প্রায় অর্ধশত পুরষ্কার। আর ঈর্ষনীয় হলেও সত্যি, স্মরন এস এস সি এবং এইচ এস সি দুবারেই সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়েই জিপিএ পাচ পেয়ে উত্তীর্ন হয়। সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ইচ্ছে থাকলেও শেষটাতে ব্যাটে বলে মেলেনি। তারপর সে ভর্তি হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ তে। আর এখানে এসেও ফুটবল বা বাস্কেটবল ক্লাব সহ অন্য সব বিভাগেই তার স্বচ্ছন্দ পদচারনা। খেলার কথা আসলেই বন্ধুরা আগে ছুটে যায় স্মরনের কাছে। আর এখানেও সর্বোচ্চ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়ছে সে। তরুন এই খেলাপ্রেমিকের জন্ম টাঙ্গাইলে শহরে, ১৯৯১ সালের ২৫শে অক্টোবর। প্রিয় শহরেই কেটেছে তার ক্যাডেট কলেজের আগের দিনগুলি। তারপর ক্যাডেট কলেজ পেরিয়ে এখন ঢাকায়। শিক্ষক বাবা মিনহাজ উদ্দিন আর গৃহিনী মা স্বপ্না ইয়াসমিনের স্বপ্ন পুরনের পথ ধরেই হেটেছেন তিনি। একমাত্র ভাই ত্বরন পড়ছে ক্লাস টেনে। স্মরন ভবিষ্যতে আর যাই করুক, খেলাধুলাটা ছাড়তে পারবেন না এটা কেউ না বলে দিলেও আমরা ধরে নিতে পারি। তার জন্য শুভকাম্না।