কলকারখানা, বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গাতেই বেআইনিভাবে শিশুদের নিয়োগ দেওয়া হয়। শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও সে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন না থাকার কারণে শত চেষ্টা করেও শিশুশ্রম বন্ধ করা যায় না। রাস্তার পাশে ওয়েল্ডিং কারখানা, গাড়ির গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, বিভিন্ন পরিবহনে শিশু দিয়ে কাজ করানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। এছাড়াও বড় বড় কলকারখানা, পোশাকশিল্প সবখানেই শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
শিশুশ্রম বন্ধে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সামাজিক সংগঠন সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন করলেও আজও শিশুশ্রম বন্ধ হয়নি। শিশুদের কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী ও কর্তাব্যক্তিরা। এরা অল্প পারিশ্রমিক দিয়েই একজন শিশুশ্রমিককে দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করাতে পারেন। বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জ ও শহর এলাকার সব বাসাবাড়িতেই শিশুশ্রমিক দেখা যায়। শহরে একটি চক্র আছে, যারা পুরানো কাগজ, লোহা-লক্কর বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করে। এরা এ কাজে গরিব-অসহায় শিশুদের কাজে লাগায়। তাদের টাকার লোভ দেখিয়ে একটি বস্তা দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। শিশুরা টাকার আশায় রাস্তায়, রাস্তায়, বাসাবাড়ির সামনে ঘুরে পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
বাসাবাড়িতে যে সব শিশু কাজ করে তাদের বেশিরভাগ সময়ই গৃহকর্তা অথবা গৃহকর্তার হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। প্রায়ই এ ধরনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মেয়েশিশু গৃহকর্তার হাতে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার শিকার হলে গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হয় এবং মামলাও হয়। অভিযুক্ত গৃহকর্তা টাকার জোরে আইনের ফাঁক দিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে যায়। টাকার বিনিময় অথবা প্রভাব খাটিয়ে নির্যাতিত শিশুর অভিভাবককে প্রভাবিত করে মামলা থেকে রেহাই পায়। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে মামলার বাদী এসব মামলা চালাতে না পারায় অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়। শিশুশ্রমিকরা ইট ভাঙা থেকে শুরু করে অনেক কঠিন পরিশ্রম করলেও তারা তাদের ন্যায্য পাওনা পায় না। এ নিয়ে অনেক এনজিও কাজ করলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
অনেক পোশাকশিল্পের গেইটে শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয় না— সাইনবোর্ড লাগানো থাকলেও কারখানার ভেতরে গেলেই লক্ষ করা যাবে শিশুশ্রমিকরা কাজ করছে। শিশুদের অনেক কঠিন কাজ করতে দেখা যায়। টেম্পো ও বাসসহ যাত্রীবাহী অনেক গাড়িতে শিশুরা টাকা ওঠানোর কাজ পর্যন্ত করে থাকে। দেশের সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা পরিচালিত পাবলিক টয়লেটগুলোতে শিশুশ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। যত নোংরা আর পরিশ্রমের কাজ শিশুদেরকে দিয়েই করানো হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে বেশিরভাগ শিশুই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিত পতিতাবৃত্তির কারণে পথশিশু, টোকাইয়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো পথ নেই। এদের পুনর্বাসন বা পথশিশু জন্মরোধে সরকারের কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। বড় বড় এনজিও মুখে শিশুশ্রম বন্ধের কথা বললেও কাজে তার মিল পাওয়া যায় না। তারা এ কাজে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা এনে তা নিজেদের বিলাসিতায় ব্যয় করে। আমাদের এ মানসিকতা ছাড়তে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে দায়িত্বশীলতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। শিশুশ্রম বন্ধে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করে সারাদেশে জোরালোভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা শিশুদের শ্রমিক হিসাবে ব্যবহার করে তাদের সচেতন করার জন্য প্রথমত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ থেকে নোটিশ জারি করতে হবে। এরপরও নিয়োগকারীরা আইন না মানলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা
