আসছে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংকটগুলোকে বড় অন্তরায় বলে উল্লেখ করেছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। চলমান রাজনৈতিক সংকটে সহিংস পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার ফলে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়াসহ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশংকা করেছেন তারা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পরবর্তী এক পর্যালোচনামূলক সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী নেতা, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও ব্যাংকাররা আলোচনায় অংশ নেন। বিভিন্ন হাইকমিশন ও দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচকদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সংশয় রয়ে গেছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ। সিপিডি’র গবেষণা প্রধান ড. ফাহমিদা খাতুন মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক বলেন, দেশে অর্থনীতির স্থবিরতা চলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ নেই। ১৯৯০ সালে দেশে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার বিশ বছর পরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোন সুযোগ নেই। বাজেটে পদ্মাসেতু প্রকল্পে ৬ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরবর্তী সরকারের হাত-পা বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মতে, পদ্মাসেতু প্রকল্পে সরকার ৬ মাসে কিছুই করতে পারবে না। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে তারাও কিছু করতে পারবে না বাজেটের অভাবে। দলীয় রাজনীতির বাইরে এসে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আহম মোস্তাফা কামাল বর্তমান সরকারের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যর্থতাগুলো উল্লেখ করে বলেন, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো আর্থিক দুর্নীতির ঘটনায় আমরা কিছুই করতে পারিনি। শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছি।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। হরতাল, গাড়িতে আগুন দেয়ার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী উত্সাহ পাচ্ছেন না।
এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরামউদ্দিন আহমেদ বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় উত্পাদন ব্যাহত হবে। তবে আমদানি শুল্ক কমানোটা ইতিবাচক। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন, প্রবৃদ্ধি কোন কিছুই হবে না। যখনই যে দল ক্ষমতায় থাকে তখনই তারা বলে হরতাল পছন্দ করি না। আবার বিরোধীদলে গেলে তারাই বলে হরতাল রাজনৈতিক অধিকার। এবারের হরতাল হিংসাত্মক, এর ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন। কিন্তু তারা চান স্থিতিশীল পরিবেশ। কালো টাকা প্রসঙ্গে কাজী আকরাম বলেন, কালো টাকা শুধু ব্যবসায়ীদেরই আছে তা নয়, পেশাজীবী, সরকারি চাকরিজীবীদেরও আছে। কালো টাকার সকল উত্স বন্ধ করতে হবে। পদ্মাসেতু প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, এ সেতু নির্মাণ করা হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়বে। সরকারের ঘাটতি অর্থের জোগান দেয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়ালে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ৬৯ হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। সরকার ঋণ গ্রহণ বাড়ালেও তেমন কোন সমস্য হবে না বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাজেটের আকার বছর বছর বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু এর গুণগত বাস্তবায়ন কমে যাচ্ছে। শেয়ার বাজারে পুন:অর্থায়ন তহবিলের উদ্যোগ ভালো কিন্তু এ খাতে দুর্নীতি রেখে শেয়ার বাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানমূলক স্পস্ট দিক নির্দেশনা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন।
সংসদ সদস্য মোঃ হাফিজউদ্দিন আহমেদ এমপি কালো টাকার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়ার জন্য সিপিডি’র প্রতি আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্য আশরাফি পাপিয়া বলেন, চুরি বন্ধ না করলে বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। হলমার্কের মতো ঘটনায় মাত্র ২ জন জেল খাটছে। এ ধরনের আর্থিক দুর্নীতির জন্য দায়ী সকলকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য অপু উকিল বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু এবারই সবচেয়ে বেশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। আসন্ন বাজেটও বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ফজলুল বারী, বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান নূরুল আমিন প্রমুখ।
