শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত বরিশালে

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৩, ২৩:২০
কয়েকটি কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, দুই মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ভোট কেন্দ্রগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি ও কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হয়। তবে একটি কেন্দ্রে দুই মেয়র প্রার্থীর মধ্যে সৃষ্ট অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। মহানগরীর বিভিন্ন ভোট কেন্দ সরেজমিন ঘুরে দেখা যায় বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে সাড়ে ৭টার দিকে একপশলা মাঝারি বৃষ্টি হলে ভোটারদের মধ্যে কিছুটা চাঞ্চল্য দেখা যায়। প্রায় সকল কেন্দে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ হলেও সকাল ১০টার দিকে কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের প্রথম ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মহাজোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজ ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে ঐ কেন্দ পরিদর্শনে যান। একই সময় সেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন জিপুর নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কেন্দে র ভিতরে প্রবেশ করে। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে শুরু হয় হাতাহাতি। ভোট কেন্দে দায়িত্বরতরা উভয়পক্ষকে কেন্দে র বাইরে বের করে দিলে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কামালের সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, মহানগর যুবদল সভাপতি রফিকুল ইসলাম শাহীন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মনোয়ার হোসেন জিপু, ছাত্রদল কর্মী ইমন, আজম ও রুবেলকে ছাত্রলীগের কর্মীরা মারধর করেছে। এ ঘটনায় ঐ স্কুলের পার্শ্ববর্তী মানিক মিয়া হাইস্কুল কেন্দ্র ও এ কাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এমপিসহ শীর্ষ নেতারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এখানেও দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেলেও তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হল, সদর গার্লস, জিলা স্কুল, সরস্বতী স্কুল, বরিশাল কলেজ, মথুরানাথ পাবলিক স্কুল, নূরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কমার্শিয়াল কলেজ, বিএম কলেজ, টিটিসি, হাতেম আলী কলেজ, কাশিপুর হাইস্কুল, তিলক কলাডেমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরুষ ও নারী কেন্দ্র, বাঘিয়া, কাউনিয়া আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ঘুরে দেখা গেছে ভোটাররা দীর্ঘ সারিবদ্ধ হয়ে ভোট প্রদান করছেন। সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এসব ভোট কেন্দ্রে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এসব কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে পুরুষ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। নগরীর মথুরানাথ পাবলিক স্কুল, বিএম কলেজ, হাতেম আলী কলেজ, রূপাতলী, কাশিপুরসহ অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রের বাইরেও প্রার্থীর সমর্থক ও ভোটারদের যথেষ্ট ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীসহ একজন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়াও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১৬ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৪৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সকাল সাড়ে ৮টায় নূরিয়া স্কুল ভোট কেন্দ্রে মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল সকাল সাড়ে ৯টায় ভোট প্রদান করেন। ভোট প্রদান শেষে প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি যে উন্নয়ন করেছি তাতে আমার বিশ্বাস নগরবাসী আমাকেই পুনরায় মেয়র নির্বাচিত করবেন। আহসান হাবিব কামাল বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে পরাজিত হলেও তা মেনে নেব। তবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেন কামাল। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে গোরস্থান রোডের আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা হয় সাবেক ব্যাংকার মো. আব্দুস সাত্তার চোকদার (৬৪) নামে এক ভোটারের সাথে যিনি ভোট দিতে ঢাকা থেকে এসেছেন। ভোট দানের পরিবেশ দেখে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এরপর মহানগরীর সবচেয়ে ভিআইপি ভোট কেন্দ্রে বিএম কলেজে গেলে দেখা হয় প্রবীণ রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদ খান, প্রবীণ আইনজীবী মোখলেছুর রহমান ও খালেক মোল্লার সাথে। তাদের অভিমত শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পলাশপুর ১নং শহীদ জিয়াউর রহমান স্কুল ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বাস্তুহারা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালামকে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সোবাহান শেখ মারধর করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। দুপুরে নগরীর পূর্ব রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুই মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় একঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। সকালে ঐ কেন্দ্র থেকে আহসান হাবিব কামালের এজেন্ট আবুল কালাম আজাদকে বের করে দেয়া হয়। এ সময় হিরন ও কামালের সমর্থকদের মধ্যে র্যাব-পুলিশের উপস্থিতিতে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ খবর পেয়ে দুই মেয়র প্রার্থী সেখানে হাজির হলে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রথমে মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন কেন্দ্রে হাজির হন। সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগ কর্মীরা তখন কামালের সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় বাকেরগঞ্জের সাবেক এমপি আবুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীকে বেদম মারধর করা হয়। ঘটনাস্থলে আহসান হাবিব কামাল পৌছালে তার উপরও হামলা করা হয়। আহসান হাবিব কামাল মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। তখন প্রায় একঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে এবং ৩টার দিকে পুনরায় তা চালু করা হয়। তিলক কলাডেমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রিজাইডিং অফিসার এনামুল হক জানান, বেশ ভালোভাবেই এ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে। এ কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়ানো এক মহিলা ভোটারকে এক কাউন্সিলর প্রার্থী প্রকাশ্যে হাতে টাকা গুঁজে দিচ্ছেন দেখা যায়। সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক নিজামুল ইসলাম নিজাম কেন্দ্রের ভিতরে অবস্থান করলে ছাত্রদল কর্মী মলয় কর্মকার তার প্রতিবাদ করেন। এ ঘটনায় মলয়কে মারধর করা হয়। এছাড়া এ কেন্দ্রে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তিনটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ ব্যাহত ২৭নং ওয়ার্ডের দিয়াপাড়া ভোট কেন্দ্রে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জয়নাল আবেদীনকে ছাত্রলীগ কর্মীরা মারধর করায় বেলা ২টায় ভোট বন্ধ করে দেয়া হয়। বেলা ৩টার পর ঐ কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। পূর্ব রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা পৌনে ২টায় দুই মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে একঘণ্টা ঐ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া নগরীর এ. করিম আইডিয়াল কলেজে নারী ভোটারদের ভোট প্রদানকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায় কিছু সময় ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। ঐ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবু জাফর খান ইত্তেফাককে জানান, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেলা ১টার পর সেখানে পর্যাপ্ত বিজিবি ও র্যাব-পুলিশ হাজির হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ব্যালট বক্স ছিনতাইকালে একজন আটক আমানতগঞ্জ পাওয়ার হাউজ কেন্দ্র থেকে জিলন (৩২) নামে এক কর্মীকে আটক করেছে র্যাব। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জিলন প্রকাশ্যে কেন্দ্র থেকে ব্যালট বক্স নিয়ে পালানোর সময় র্যাব তাকে আটক করে।