এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তবে মনে হচ্ছে, এছাড়া আর কোনো রাস্তাই নেই তাদের সামনে। বিশ্লেষকরা অন্তত সেরকমই বলছেন। বিবিসির ধারণা, ১৯৫০’র দশকে কেনিয়ার মাউ মাউ বিদ্রোহের সময়ে গণহত্যা ও নির্যাতনের কারণে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাইবে ব্রিটিশ সরকার; সংসদে দাঁড়িয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগের আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করাটাই পর্যাপ্ত নয়। আদালতের বাইরের সমঝোতায় নির্যাতন সওয়া এবং এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকা ৫২২৮ জন মাউ মাউ বিদ্রোহীকে ৬ মিলিয়ন পাউন্ড মামলার খরচসহ মোট ১৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। সেইসঙ্গে ঔপনিবেশিক নির্যাতনে নিহতদের স্মরণে নাইরোবিতে নির্মাণ করে দেয়া হবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ব্রিটিশ ল’ ফার্ম লি ডে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কেনিয়ানের প্রতিনিধিত্ব করছিল, যাদের দাবি- ভূমি ফেরত ও ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের জন্য আন্দোলন করার অপরাধে নির্যাতন কিংবা অপ-আচরণের শিকার হতে হয়েছিলো। ক্ষতিগ্রস্তরা ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে অনেক বছর ধরে। তাতে কাজ হচ্ছে না দেখে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছিলো আদালতে। তাও কেটে গেছে দু’বছর। রায় পাওয়া না গেলেও বোঝা যাচ্ছিলো, তা ফরিয়াদীদের পক্ষে যাবে। তা উপলব্ধি করেই যুক্তরাজ্য সরকার আদালতের বাইরে বিষয়টির সুরাহা টেনেছে। এতে হয়তো ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেকটা কমেছে। তবে ক্ষমা হয়তো ঠিকই চাইতে হবে কেনিয়ার কাছে। শুরুতে ব্রিটিশ সরকার যুক্তি দেখাচ্ছিলো, ১৯৬৩ সালে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর মাউ মাউ গণহত্যা ও নির্যাতনের দায়ভার কেনীয় প্রজাতন্ত্রের উপর বর্তিয়েছিলো। কাজেই এর দায়-দায়িত্ব ব্রিটেনের নয়। কিন্তু এসব মানতে নারাজ ছিলেন ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে নেতৃত্ব দেয়া পাওলো মুওকো এনজিলি, ওয়ামবুগা এনিগনি ও জেইন মুথনি মারা। তারা ২০১১ সালে দ্বারস্থ হন ব্রিটিশ হাইকোর্টের। হাইকোর্টও প্রথমে বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। মামলা আমলে নেয়া যায় কি-না তার জন্য সে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। অবশেষে ২০১২ সালের অক্টোবরে রুল জারি করা হয়, ফরিয়াদীরা সঠিক মামলাই প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এর বিচারকার্য এখন সম্পন্ন হবে। এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিসকে (এফসিও) নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে। কিন্তু এফসিও জানিয়েছিলো, এক্ষেত্রে তারা দারুণ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। কারণ পর্যাপ্ত চাক্ষুষ সাক্ষী ও ডকুমেন্টের অভাব রয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভের সাহায্য নিয়ে ডকুমেন্ট জমা দেয় তারা ২০১২ সালের নভেম্বরে। তাতে বলা হয়, ১৯৫৯ সালের ৩ মার্চ ডিটেনশন ক্যাম্পে বিষ মেশানো পানি খেয়ে ১১ জনের মৃত্যু ঘটেছিলো আর প্রিজন ওয়ার্ডারদের হাতে আহত হয়েছিলো ডজনখানেক লোক। কিন্তু কেনিয়া এমন ডকুমেন্টকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে, আসল ঘটনার ছিটেফোঁটাও এতে প্রতিফলিত হয়নি।
মাউ মাউ শব্দটির উত্স নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। কেনিয়ার কিকুয়ু জনগোষ্ঠীর ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনকারীরা এ নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো। ব্রিটিশরা তাদের মাউ মাউ নামে ডাকলেও তারা নিজেদের পরিচয় দিতো কেনিয়া ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম আর্মির (কেএলএফএ) সদস্য হিসেবে। ধারণা করা হয়, উমা শব্দটিই উল্টে মাউ হয়ে গিয়েছিলো। দু’বার উচ্চারিত হওয়ায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ভাগ ভাগ’। যাইহোক, ব্রিটিশদের উদ্দেশেই যে মাউ মাউ শব্দ দু’টি ব্যবহূত হতো এটি নিশ্চিত। ১৯৫৬ সালের ২১ অক্টোবর বিদ্রোহীদের নেতা দেদান কিমাথিকে গ্রেফতারের পরই মূলত আন্দোলনের বিদায় ঘণ্টা বেজে গিয়েছিলো। ব্রিটিশদের পুরনো কৌশল ‘ডিভাইড এন্ড রুল’-এর কারণেই বিদ্রোহ ব্যাপক জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছিলো। আন্দোলনের সময়কাল ছিলো ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল। বিদ্রোহীরা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ হলেও ভিত নড়ে গিয়েছিলো ঔপনিবেশিক শক্তির। যে কারণে ১৯৬৩ সালে তল্পিতল্পা গোটাতে বাধ্য হয় ব্রিটেন। ১৯৫৬ সালের শুরু থেকেই মাউ মাউ বিদ্রোহীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছিলো। গ্রেফতারকৃতদের আটকে রাখা হতো কেনিয়ার পূর্বাঞ্চলে গারিসা শহরের কাছাকাছি হোলা ডিটেনশন ক্যাম্পে। ১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে ক্যাম্পের ভেতরেও আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সেই হোলা ডিটেনশন ক্যাম্পেই আটক ছিলেন পাওলো মুওকো এনজিলি, ওয়ামবুকা এনিগনি ও জেইন মুথনি মারা। তাদের মুখ থেকে নির্যাতনের বর্ণনা শুনলে অন্যদের গা শিউরে উঠে। দিনে খাবার দেয়া হতো একবার। একটু এদিক-ওদিক হলেই চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। নেতৃত্ব দেয়ার চেষ্টা করলে এর শাস্তি ছিলো— খোঁজা করে দেয়া। তাদের কাজ করতে অপারগতা জানালে বুট দিয়ে পাড়ানো হতো। কম বয়সী নারী হওয়ার মানেই ছিলো ব্রিটিশ সেনা সদস্যদেরকে বিছানায় সঙ্গ দেয়া। এসবের ক্ষতিপূরণ পেতেই আদালতের দারস্থ হয়েছে কেনীয়রা। হয়তো কিছু পাবেও। তবে কতো করে পাবে সে সম্পর্কে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। একটি হিসেব অনুযায়ী, মাউ মাউ গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে কেনিয়ার ক্ষতির পরিমাণ তখনই ছিলো ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কেনিয়ার মানবাধিকার কমিশন বলছে, মাউ মাউ বিদ্রোহের সময়ে হত্যা কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো ৯০ হাজার লোক। এর মধ্যে অনেকেই বরণ করেছিলো পঙ্গুত্ব। জমি কেড়ে নেয়া হয়েছিল ৭০ লাখ লোকের।
