চরাঞ্চল ও উন্নয়ন

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৩৬
১৬টি নদীবিধৌত জেলা কুড়িগ্রাম। নদীভাঙ্গনে প্রতি বছর আশ্রয় হারাচ্ছে ৪ হাজার পরিবার। ছিন্নমূল মানুষের নিরন্তর এ মিছিলে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে বন্যার ছোবলে নিঃস্ব হাজারো নর-নারী। নদী একদিকে শিকার বানিয়ে গিলে খাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, অন্যদিকে জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ চর। এ রকম ৪০৫টি চর এবং সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে ১০ লক্ষাধিক অসহায় মানুষ। এখানে বসবাসরত মানুষের জীবিকা কৃষি কাজের পাশাপাশি নদীতে মাছ ধরা। নদী ভরাট ও পানি দূষণের ফলে সারাদিন জাল টেনেও যে উপার্জন হয় তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো কঠিন। চরের মানুষের জন্য নেই কোন চিকিত্সার ব্যবস্থা, না আছে বিনোদনের কোন উপায়। তাই চরের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ, বহুবিবাহ এবং বাল্য বিবাহ একটি নিত্য নৈমি্ত্তিক ব্যাপার। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড হলেও ১০ লক্ষাধিক চরবাসীর জন্য শিক্ষাকে সার্বজনীন করা এখনো সম্ভব হয়নি। ১০০ টির মতো চরে নেই কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর সমস্ত চর জুড়ে মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা মাত্র ০৯ টি। অনেক চরের স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীর দেখা মিললেও শিক্ষকের দেখা পাওয়া ডুমুরের ফুলের দর্শন লাভের মত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই দায়িত্ব পালন করছেন প্রক্সির মাধ্যমে। চরবাসীরা গরু-ছাগলকে সন্তানতুল্য যত্নে পালন করেন। কিন্তু দুর্যোগ ও বন্যায় এই পশুগুলোর স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকরী কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। ফলে প্রতি বছর বন্যা এলেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এসব প্রাণী। চরের মানুষের চিকিত্সা ব্যবস্থা এখনো ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজের উপর নির্ভরশীল। কিছুদিন আগে সাহেবের আলগা চরে তিন বছরের শিশুর দরবেশ হয়ে ওঠার কল্প কাহিনী সে কথাই প্রমাণ করে। রাত্রে কখনো গর্ভবতী কোন মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বাঁচা-মরা মৃত্যুদূতের সদিচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। দুর্গম কোন চর থেকে উপজেলা সদরে আসতে ১০/১২ ঘন্টা নৌকায় ভ্রমণ করতে হয়। চরবাসী সকলেই নৌকা ব্যবহার করার মত সচ্ছলও নয়। পরিবার পরিকল্পনা বা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কোন কর্মী এসব দুর্গম চরে একবার গিয়েছেন এটি বলার মত সত্ সাহস অনেক স্বাস্থ্যকর্মীর নেই। চরবাসী জনগণ সপ্তাহে একদিন মাত্র বাজার করে এবং একটি মাত্র তরকারি দিয়ে খাবার খান। খোলা পায়খানা ব্যবহার এবং নদীর পানি পান করা চরবাসীর জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এ অন্ধকারের পিছনেই রয়েছে আলোর ইশারা। উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এ নদী ও চরগুলো হয়ে উঠতে পারে কুড়িগ্রামের উন্নয়নের মাপকাঠি।