কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় নদীভাঙ্গন। প্রতিনিয়ত ভাঙছে নদী, পুড়ছে কপাল, বাড়ছে নি:স্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। প্রতি বছর বর্ষা এলেই নদীভাঙনে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও আবাদী জমি হারিয়ে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমায় শহর কিংবা অন্য কোথাও। অসহায় সে মানুষগুলোর আর্তি শোনার কেউ নেই।
জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর, শংকোষ, ফুলকুমার, নীলকমল, ধরলা, তিস্তা, কালজানি, শিয়ালদহ, বোয়ালমারী, সোনাভরি, হলহলিয়া, জালছিড়া, জিঞ্জিরাম, ধরণী, গদাধর এসব নদ-নদী। এসব নদ-নদীর ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে জেলার অধিকাংশ মানুষের ভাঙ্গছে সুখস্বপ্ন-কপাল। দুঃখী মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবে এ নদীগুলোর ভূমিকা কম নয়। প্রতি বছর ভাঙনের শিকার হাজার হাজার মানুষ তাদের সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে যাচ্ছে। বসতভিটা, আবাদী জমির পাশাপাশি অনেকের মাথার উপর ছাদটুকু নেই। খোলা আকাশের নিচে তারা বসবাস করে। কেউ বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগে নির্মিত বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়ে সন্তান-সন্ততি ও পরিজন নিয়ে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউবা আত্মীয়-স্বজন ও জন্মস্থানের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছে অন্যত্র। অথচ কিছুদিন আগেও সে মানুষগুলোর সংসারে ছিল শান্তি, ছিল সুখ।
প্রমত্তা দুধকুমার ভাঙছে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গার চর রহমানেরকুটি, চর লুছনি, তেলিয়ানী, মালিয়ানী, মুড়িয়া, পাঁচমাথা, মিনা বাজার। বেরুবাড়ী ইউনিয়নের খেলাভিটা গ্রাম ও চর বেরুবাড়ীর কিছু অংশ। কালীগঞ্জ ইউনিয়নের সিএনবি বাঁধের শুরু থেকে দক্ষিণে প্রায় দেড় কিলোমিটার, সিএন্ডবি বাঁধের উত্তর-পশ্চিমের গ্রাম কুমরিয়ারপাড়ের অর্ধেক ও ধনীর পাড় গ্রামের বেশিরভাগ অংশ চলে গেছে নদীগর্ভে। নুনখাওয়ার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের ১শ’ মিটার, বোয়ালমারী গ্রামের প্রায় শত একর আবাদী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নুনখাওয়া উচ্চ বিদ্যালয়, হাফিজিয়া মাদ্রাসা, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ ও নুনখাওয়া বাজার। কচাকাটা ও কেদার ইউনিয়ন দুধকুমর ও শংকোষের ভাঙনে জর্জরিত। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধর মিলে ভাঙছে বল্লভের খাস ইউনিয়নের প্রাণ কেন্দ মাদারগঞ্জ বাজার। এর বেশিরভাগ অংশ চলে গেছে নদীগর্ভে। ব্রহ্মপুত্র ভাঙছে নারায়ণপুর ইউনিয়নে চরঝাউকুটি উত্তর, চরঝাউকুটি দক্ষিণ, চর বারোবিশ, অষ্টআশীর চর, চর নুনখাওয়া, চর মাঝিয়ালী, চর পাখিউড়া, চর আইড়মারী, চর ভেড়ামারা, কালাইয়ের চর, চর বালারহাট, চর চৌদ্দঘুড়ি, চর শৌলমারী গ্রাম।
দুধকুমার, শংকোস ও গদাধর মিলে কমবেশি ভাঙ্গছে ভুরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি, তিলাই, চর ভুরুঙ্গামারী, বঙ্গ সোনাহাট, বলদিয়া, পাইকের ছড়া, আন্ধারীঝাড়, ভুরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়ন। ভাঙ্গনে সোনাহাট রেলওয়ে সেতু ও সংযোগ সড়ক হুমকির মুখে।
ধরলা ভাঙ্গছে ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের যতীন্দ নারায়ন, প্রাণকৃষ্ণ, যুথ কৃষ্ণহরি, কবির মামুদ, তালুক শিমুলবাড়ী, চর শিমুলবাড়ী, বড়ভিটা ইউনিয়নের চর ধনীরাম, পশ্চিম ধনীরাম, চরবরলই, নাওডাঙ্গার চর গোরক মন্ডল, কাঞ্চাপাড়া, ফুলবাড়ী সদরের বড়ানদী, কুলাঘাট।
একইভাবে ধরলা গিলে খেয়েছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের আরাজীপাড়া, গারুহারা, ঘনেশ্যামপুর, শুলকু বাজার ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের গবিন্দপুর। গারুহারা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত বাঁধের প্রায় ১৫-২০ ফুট দূরে নদীভাঙ্গন চলছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া না হলে খুব অল্প সময়ে চলে যাবে নদীগর্ভে।
ইতোমধ্যে এসব নদ-নদী ভাঙ্গনে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী অনেক জনপদ ও স্থাপনা। ৯ উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নের মানচিত্র বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
