নদীর পাড়ের লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৪০
সুদুর অনুজ্জ্বল কুয়াশাচ্ছন অতীতে, যখন পৌরাণিক কাহিনী ও ইতিহাস হয়েছে একীভূত তখন থেকেই রঙ্গপুর অঞ্চল তথা এই কুড়িগ্রাম মহাভারত কালের প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য ও কালিকা পুরাণ এবং যোগিনীতন্ত্র কালের কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজা মহীরঙ্গ দানব শাসিত সেই কামরূপের অন্তর্ভুক্ত রঙ্গপুর, আজকের বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল। সুপ্রসন্ন ভাগ্যের সন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল হতে ঢল নেমেছিল এ অঞ্চলে, অনেক জনগোষ্ঠী ও ভাষাভাষীদের। কালের প্রবাহে স্বাভাবিক নিয়মেই সৃষ্টি হয়েছে এ অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় লোককৃষ্টির। কর্ম ও পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে লোকমনে জন্ম নিয়েছে “ইচ্ছে ও স্বপ্নেরা”। কর্ম অবসরে সেই স্বপ্ন, ইচ্ছে আর অনুভূতিরা একাত্ম হয়ে এক সময়ে সুরের ডানায় ভর করে রূপলাভ করেছে লোকসঙ্গীতের। নদী ও নারী হচ্ছে লোককৃষ্টির তথা লোকসঙ্গীতের অন্যতম প্রধান প্রদায়ক। নদী বা জলধারা হচ্ছে জীবনের প্রধান সঞ্চালক, আর নারী হচ্ছে জন জন্মদাত্রী প্রসূতি। খাদ্য ও জল এর কারণেই প্রাচীন জনপদ বা জনসভ্যতাগুলি গড়ে উঠতো নদ-নদী সমূহের অববাহিকার উর্বর অঞ্চলগুলিকে কেন্দ করে। আর সেই জনসভ্যতা লালনে প্রধান ভূমিকা ছিল নারীর। হয়তো সে কারণেই বিশ্বজুড়ে সকল লোককৃষ্টিতে পরিলক্ষিত হয় নদী ও নারীর এক অনস্বীকার্য সম্পৃক্ততা। নদী ও নারী ব্যতিরেকে জন গোষ্ঠীর বা অঞ্চলের কর্মজীবন বা শ্রমজীবিকার এবং পরিবেশের এক বিশাল প্রতিফলন রয়েছে লোককৃষ্টির গঠন শৈলীতে। সেজন্যই সম্ভবতঃ জীবিকার প্রকৃতি, ছন্দ, গতি, সঞ্চালিত হয় এতে। পরিবেশের — রূপ, রং, রঙ্গ, গন্ধ, স্বাদ, লালিত্য, কাঠিন্য, বিষণ্নতা, আশা, হতাশা, ইত্যাদি রঙ্গীন তুলির শেষ আঁচড় টানে লোককৃষ্টির কাঠামোতে। বাংলাদেশের উত্তর জনপদের বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের লোককৃষ্টির প্রাচীনতম ঐতিহ্যের অন্যতম একটি হচ্ছে লোকসঙ্গীত যা ভাওয়াইয়া নামে পরিচিত ও প্রশিদ্ধ। এতে মাটির গন্ধ ও হূদয়ের অনুভূতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ বিদ্যমান। সুদূর অতীত হতেই গরু, মহিষ, হস্তীর লালন পালন ছিল (বৃটিশ গ্যাজেটিয়ার) এ অঞ্চলের অন্যতম পেশা। হস্তীর ব্যবহার হতো যুদ্ধে, ভারি বস্তু উত্তলন ও শিকার কার্যে। গরু-মহিষ ব্যবহূত হতো কৃষিকর্মে, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যের উত্স হিসেবে। নিম্নভূমি ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ছিল গবাদিপশুর চারণভূমি, নদী তীরবর্তী অঞ্চলে হাতী চরানো হত। এসব চারণভূমিই ছিলো বাত্সরিক চুক্তিবদ্ধ রাখাল, মৈশাল, মাহুতদের কর্মস্থল ও কর্মকালীন সাময়িক আবাস। লোকসঙ্গীত-ভাওয়াইয়ার বহুলাংশ জুড়ে রয়েছে এই কর্মজীবীদের হূদয়ের আবেগমথিত কাহিনী, বিরহ, ভালোলাগার কথা। বাদ যায়নি গৃহে ফেলে আসা তাদের অসহায় বিরহী নারীদের আর্তিকথা। এদের হূদয় ও কণ্ঠজুড়ে ছিল সেই “মুঁই নারী”দের অব্যক্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ এর মর্মকথা। সে বিচারে সুদূর অতীতের নিরক্ষর এই লোকেরা ছিল আজকের নারী স্বার্থরক্ষকদের পথিকৃত্। প্রাচীন ভাওয়াইয়াগুলির অধিকাংশই নারী জীবনের পটভূমিতে রচিত, যদি’বা এগুলি পুরুষ লোকশিল্পীদের সৃষ্ট ও গীত। যাইহোক, কঠোর পরিশ্রমান্তে আকারী চাউলের ভাত ও বাথানের সহজলভ্য বকনা গরু-মহিষের দুধ খেয়ে ক্লান্ত বিরহী অবসরে এই রাখাল মৈশাল মাহুতদের কণ্ঠে একদা গুঞ্জরিত সুর ও বাণীই আজকের ভাওয়াইয়া তা নি:সন্দেহে বলা যায়। লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়ার অঞ্চলঃ ভাওয়াইয়ার আদি বা অবিভক্ত অঞ্চল বলতে বলা যায় যে অঞ্চলগুলিতে রংপুরী বা রাজবংশী dialect এ কথা বলা হতো সেগুলিকে। যেমন—রংপুর জেলা, নেটিভ স্টেট কুচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলা, আসামের গোয়ালপাড়া জেলা ও দার্জিলিং তরাই অঞ্চল। বাংলাদেশের ভাওয়াইয়া অঞ্চল বলতে ভাওয়াইয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিচার্যে এনে বলা যায়—বৃহত্তর রংপুর জেলা ও এর সংলগ্ন পার্শবর্তী জেলাসমূহের ততটুকু অঞ্চল যেখান পর্যন্ত রংপুরী উচ্চারণের প্রচলন আছে ও লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া orally transmitted হয়েছে। ভাওয়াইয়ার জন্মলগ্নঃ বিভিন্ন গবেষকদের কঠিন যুক্তিতর্ক সাপেক্ষে ১৩শ, হ’তে ১৫শ খৃষ্টাব্দের দিকে, ও অপেক্ষাকৃত সন্দেহাতীতভাবে ১৬শ খৃষ্টাব্দে। অনেকে মনে করেন চর্যাপদ কাল থেকেই ভাওয়াইয়ার জন্ম। কিন্তু এটাকে অকাট প্রমাণিত করা বোধ হয় কারো পক্ষে সম্ভব হয় নাই। প্রথমটি যে পদটির সঙ্গে অনেকেই ভাওয়াইয়ার ভাষার সঙ্গে মিল খোঁজে সেটি হলো “টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী । হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী” (Text-৩৩ চ-৯৩, Xb & XY পাদানাম্)। তিব্বতিতে টাল মানে শহর। আর যে সুরে এই পদটি গাওয়া হতো তাতে যে রাগের মিল আছে তা হলো—পটমঞ্জরী। পটমঞ্জরীর স্বরবিন্যাস হচ্ছে—বিলাবল ঠাটে—সুদ্ধ নিখাদ এবং কাফি ঠাটে—উভয় গান্ধার ও উভয় নিখাদ বিদ্যমান। প্রশ্ন হলো জীবিকাযুদ্ধে ক্লান্ত ভাওয়াইয়ার লোকশিল্পী কষ্ট করে কেন সুদ্ধ নিখাদ লাগাতে যাবে? তবে চর্যার Text-৬ এর “——— আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী——।” র সঙ্গে অধুনালুপ্ত একটি প্রাচীন ভাওয়াইয়া যা পরবর্তীতে পদ্মপুরাণ লোকনাট্যের বিখ্যাত পয়ার এ পরিণত হয় “——— ধলা কৈতরের বাঁজরে বৈরী——।” আর্তি উপস্থাপনার একটা মিল রয়েই যায়। একদা প্রাগজ্যোতিষের এ অঞ্চলটিতে যে নামেই হোক লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া ছিল লোক-বসতি-লগ্ন থেকেই বলে আমার বিশ্বাস। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই লোকবসতি যেখানে থাকবে সঙ্গীত সেখানে জন্মলাভ করবেই, অন্তত মনোরঞ্জনের জন্য তো বটে। তখন এ অঞ্চলে সেই গান যে নামেই থাকুক না কেন, এ অঞ্চলের লোকদের জীবিকা, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, পশুপাখি, নদী, নারী, মন-মানসিকতা, ভাষা, উচ্চারণ ইত্যাদি সেই গানকে শুধুমাত্র এক কাঠামোতেই চালিত করতে পারে- তা হ’ল এই ভাওয়াইয়া। তবে হ্যাঁ, কালপ্রবাহে সকলকিছুর যেমন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তেমনি হয়তো সেই লোকসঙ্গীত আর আজকের ভাওয়াইয়ার বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে কিছুটা হলেও পার্থক্য থাকতে পারে। মহাভারত-উত্তর কালপ্রবাহে ধীরে ধীরে ক্ষীরপাখ্যা হল দুধকুমার, লৌহিত্য ব্রহ্মপুত্র হল, ত্রিস্রোতা হল তিস্তা, সিতপ্রভা ধরলা হল, এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের নামকরণ হল—ভাওয়াইয়া। সত্যি কথা বলতে কি, আমার মনে হয়, ভাওয়াইয়া লোকসঙ্গীতটির জন্মলগ্ন আজ আর সঠিকভাবে উদঘাটন সম্ভবপর নয়। ভাওয়াইয়া নামের উত্পত্তি? আমার গবেষণায় অন্যতম কঠিন প্রশ্ন ছিল এটি, অনেক সময় ব্যয় করেও একটি “অকাট” বা “নিকট—সিদ্ধান্ত” নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তবু জানিয়ে দিচ্ছি যে, সব মতবাদ বিভিন্ন বইয়ে আমি পেয়েছি। এগুলির কোনটির সাথে একমত হতে পারিনি, কারণ আমার মনে হয়েছে এ ধরনের কথা বা যুক্তি আমাদের এলাকার লোক বা folk-দের দেয়া নয়, অন্য কোন জনদের দেয়া হবে হয়তো, যা অরোপিত হবে হয়তো এবং স্বতঃস্ফূর্ত নয়। যাই হোক তুলে ধরছি মতামতগুলি — (ক) ভাওয়াইয়া এসেছে ভাওয়া শব্দ থেকে। ভাওয়া মানে সেখানে বলা হয়েছে মহিষের নিচু চারণভূমি। (খ) বাও (বাতাস) থেকে বা ভাও (ভাব) থেকে এসেছে ভাওয়াইয়া (ভাব>ভাও)। (গ) বাউদিয়া বা বাউড়া থেকে এসেছে ভাওয়াইয়া। (ঘ) বাওয়াইয়ার বিবর্তিত রূপ ভাওয়াইয়া। (ঙ) উদাস হাওয়ার মতো এই সুরের মতো গতি, তাই এর এর নাম ভাওয়াইয়া। (চ) যে গান মনকে উদাস করে বা মনকে ঘর ছাড়া করে সেই গানকে ভাওয়াইয়া বলে। (ছ) ভাবে বিভোর প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি বলে এই গানগুলি ভাওয়াইয়া নামে খ্যাত। (জ) ভাটির সঙ্গে সম্পর্কিত বা সম্বন্ধযুক্ত ভাটিয়ালি আর ভাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বা সম্বন্ধযুক্ত হচ্ছে ভাওয়াইয়া। এ প্রসঙ্গে আমার মনে একটি প্রশ্নে উদয় হয় যে, “ভাওয়া” শব্দটি কোন গানে নেই কেন? ‘বাথান’ আছে ’নিধুয়া পাথার’ আছে, আছে ‘বিন্নাটারী’, ‘এলুয়া’, ‘কাশিয়া’, ‘দোলা’, ‘নলখাগড়া’, ‘বাওকুম্টা’ও বাদ যায় নাই। তবে কি ‘ভাওয়া’ নামক কথিত শব্দটি সেই সব লোকশিল্পীদের অশ্রুত ছিল, যেমন আমাদের অনেকের আছে। উল্লেখ্য: ভাওয়া শব্দটি আমার অশ্রুত, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, রত্নাই, জালছিড়া, হলহলিয়া, ভাঙ্গামোড় ইত্যাদি নদী তীরের অনেক প্রবীণ লোকের নিকট হতেও এসম্পর্কে জানতে পারিনি। শব্দটি সেই আমার মতো তাদেরও অশ্রুত। যাই হোক গবেষকরা ভাওয়াইয়া নামকরণের উত্পত্তি কোথা থেকে সে বিষয়ে নিশ্চিত ও একমত হতে পারেন নাই কখনো। আর আমার মনে হয় এটা খুব বড় একটা ব্যাপার নয়। ‘‘ভাওয়াইয়া” শব্দ তল্লাশ প্রাপ্ত তথ্যাদি ক) ১৯০৩ সালের পূর্ববর্তী সময়ে কোথাও ভাওয়াইয়া নামক শব্দটি ব্যবহূত হতে দেখা যায় না; ১৯০৩ সালে গ্রীয়ারসনের লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে প্রথম দুটি দৃশ্যত: ভাওয়াইয়া গানের বাণী, অঞ্চলের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত নামে প্রকাশিত হয়। এর পরবর্তী সময়ে এই লোকসঙ্গীতটি হ রঙ্গপুরের অন্য লোকসঙ্গীতগুলির প্রতি রঙ্গপুরসহ বাঙ্গালার তত্কালীন সাহিত্য প্রেমিকদের আগ্রহ জন্মায়। “ ভাওয়াইয়া গান সর্বপ্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করে জর্জ গ্রীয়ার্সনের। তিনি ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তার গ্রন্থে স্থান দেন। এরপর ১৩১৫ বঙ্গাব্দে হরলাল দাস কুন্ড ও ১৩১৬ বঙ্গাব্দে যাদবেশ্বর তর্করত্ন “রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষত্” পত্রিকায় ভাওয়াইয়া সম্পর্কে আলোচনা করেন”। বস্তুতঃ, প্রথম মুদ্রিত-প্রকাশিত ভাওয়াইয়াটি স্যার আব্রাহাম জর্জ গ্রীয়ার্সন ১৮৯৮ খৃ: এ সংগ্রহ করেন বলে ১৯০৩ সালে প্রকাশিত লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, ভালউম-৫, খন্ড-১ এর পৃ: ১৮৫ তে উল্লেখ আছে। যাহা হউক, উপরোক্ত তথ্যসমূহ হতে প্রতীয়মান হয় যে, ভাঐয়া বা ভাওয়াইয়া শব্দটি বা নামকরণটি বঙ্গাব্দ ১৩১৫ সন (১৯০৮ খৃ:) এর পরবর্তীকালে উত্পত্তি বা ব্যাবহার হয়, এবং সম্ভবত: নামকরণটি আঞ্চলিক লোকসমাজ প্রদত্ত নয়। খ) বঙ্গাব্দ ১৩১৬ সনে, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকায় (দ্বিতীয় সংখ্যা), শ্রী পঞ্চানন সরকার তাঁর “রঙ্গপুরের পুরাতন গ্রাম্য সঙ্গীত” নামীয় প্রবন্ধে উল্লেখ করেন ।