প্রজন্মের হর্টিকালচারিস্ট

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৪৭
ড. নজরুল ইসলাম অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এক নজরে নজরুল ইসলাম ডাকনাম :নজরুল জন্মতারিখ ও স্থান :২৭ নভেম্বর, রংপুর মায়ের নাম :রাবেয়া খাতুন বাবার নাম :ইয়াকুব আলী সরকার প্রথম স্কুল :পিটিআই স্কুল, রংপুর প্রিয় মানুষ :বাবা প্রিয় উক্তি :‘স্বাস্থই সকল সুখের মূল’ প্রিয় পোশাক :প্যান্ট-শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :ভ্রমণ, গান শুনে ও বই পড়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :যে কাজটা করতে চাই, যেখানে পৌঁছাতে চাই, সেখানে সত্ভাবে পৌঁছানো। দশ ভাইবোনের বিশাল পরিবারে তিনি একটু অন্য রকম ছিলেন। খুব মনোযোগী ছিলেন পড়াশোনায়। সব পরীক্ষাতেই তার প্রথম হওয়া চাই। পড়াশোনাপাগল এই ছেলেটির নাম নজরুল ইসলাম। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে রংপুরে। স্থানীয় স্কুল-কলেজ থেকে এসএসসি-এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদায়লয়ে। স্কুল-কলেজের ফার্স্ট বয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও নজর কাড়লেন শিক্ষকদের। দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীনই এক শিক্ষক তাকে জানালেন, ‘যদি পড়াশোনাটা ঠিকঠাক চালিয়ে যেতে পার, তোমাকেই আমরা শিক্ষক বানাব।’ শর্ত পূরণ করে চমকে দেওয়া ফলাফল করেন নজরুল। কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউটে, যা আজকের শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর কর্মরত অবস্থায়ই তিনি নরওয়ে থেকে ডক্টরেট ও পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। নজরুল ইসলামের সৌভাগ্য হয়েছে দেশ-বিদেশের নানা জায়গার কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম দেখার। তিনি মনে করেন কৃষিখাতে উত্পাদন বাড়লেও নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছি আমরা। বিশেষত কোয়ালিটির দিক দিয়ে এখানে অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে আমাদের। এই কাজগুলো না করতে পারলে এত অর্জনের পরও পিছিয়ে থাকব আমরা। এই লক্ষ্যে তিনি নিজেও অনেক কাজ করছেন। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা দাবি করেন তিনি। কৃষি পেশার সাথে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে নিয়ে তিনি একটি ফোরামও করেছিলেন। প্রজন্মের এই উদ্যানতত্ত্ববিদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, দেশে এ কাজের কেমন সুযোগ রয়েছে? তিনি বলেন, ‘কাজের সম্ভাবনা প্রচুর। সুযোগটা খুঁজে নিতে হবে, সেই সাথে যারা উপরের দিকে থাকবেন তাদের নিঃস্বার্থভাবে কিছুটা কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই হয়তো তরুণ প্রজন্ম যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ করে নিতে পারবে।’ তিনি জানান, বাইরের দেশগুলোতে হর্টিকালচারিস্টের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়ে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়তে বহির্বিশ্বের শিক্ষার্থীদের তুমুল আগ্রহ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হর্টিকালচার স্কিলস অস্ট্রেলিয়া ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের শতকরা ৯৫ ভাগই বিদেশি। কৃষিভিত্তিক দেশ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরও সেখানে শিক্ষা লাভ করে এ বিভাগে সাফল্য অর্জন ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কাজেই উদ্যান বিজ্ঞানের প্রতি এ দেশের শিক্ষার্থীদেরও আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। এর মাধ্যমে যেমন আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব, তেমনি নিশ্চিত কর্মসংস্থানের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিখাতই আগামী দিনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কৃষিতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে বছরে দুই হাজার তরুণ চাকরির বাজারে আসছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষি খামার গড়ে তুলে একে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কৃষিবিদদের পেতে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। যিনি মানুষের সুন্দর থাকার জন্য নির্ভেজাল পণ্য উত্পাদনের ভাবনাতেই জীবনটা অতিবাহিত করে চলেছেন, তার নিজের জীবনটা কেমন? জানালেন, চার ছেলেমেয়ে—নোভা, নিতু, রিফাত আর শায়ানকে নিয়েই তার এখনকার জীবন। স্ত্রী শরমিন চৌধুরী নিজেও একজন উদ্যানতাত্ত্বিক। এ দেশের কৃষিতে আরও অবদান রেখে যাবেন নজরুল ইসলাম, এই শুভকামনা। ০০ অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান জাতীয় পরামর্শক বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, জাতিসংঘ এক নজরে কামরুল হাসান ডাকনাম :সালাম জন্মতারিখ ও স্থান :১৪ নভেম্বর, চুয়াডাঙ্গা মায়ের নাম :আয়েশা খাতুন সিদ্দিকা বাবার নাম :মো. তাহাজ উদ্দিন প্রথম স্কুল :ঘোষবিলা প্রিয় মানুষ :বাবা প্রিয় পোশাক :ফরমাল যেকোনো ধরনের পোশাক অবসর কাটে যেভাবে :টিভি দেখে, বই পড়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা ও পরিশ্রম। সত্তরের দশকে আগে যেখানে আট কোটি মানুষের মুখে সঠিকভাবে খাবার জুটত না। কিন্তু বর্তমানে কৃষিকে আধুনিকায়ন করে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও উন্নত মানের বীজ উত্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিবিদরা ষোল কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। আগে অভিভাবকরা সন্তানের মাথার ভেতর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বীজ ঢুকিয়ে দিতেন। সন্তানরাও তা-ই চাইত। তবে সময় এখন বদলেছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে কিছুটা দেশপ্রেম থেকেই পুরোনো ধ্যানধারণাকে ভেঙে দিয়ে এখন অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে কৃষিবিদ পেশার প্রতি। আর সেই যাত্রায় অনন্য দৃষ্টান্ত কামরুল হাসান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রেখে তিনি ভর্তি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর শুধু ভর্তি হয়েই থেমে থাকেননি। নিজের যোগ্যতায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেছেন উদ্যানতত্ত্বে। তারপর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই যোগ দেন। বর্তমানে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে দেশের জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অধীনে। তরুণ প্রজন্মের এই পেশার প্রতি আগ্রহ রয়েছে জানিয়ে কামরুল হাসান বলেন, ‘মাটি ও ফসলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানেই পিছিয়ে পড়া ভাবতেন অনেকে। কৃষিকে উচ্চশিক্ষা ও পেশা হিসেবে বেছে নেবেন—এমন কথা চিন্তাও করতে পারতেন না শহুরে আধুনিক তরুণ-তরুণীরা। এ ভাবনাগুলো আজ অচল। কৃষি খাত শিক্ষিত তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। বিশ্বজুড়ে কৃষি খাতকে বলা হচ্ছে সম্ভাবনাময় ‘সবুজ পেশা’র ক্ষেত্র। কৃষি এমন একটি ক্ষেত্র যা থেকে আমাদের মৌলিক চাহিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি পূরণ হচ্ছে, তা হলো খাদ্য। আমাদের মতো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দেশে খাদ্য ঘাটতি পূরণ একটি কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে এই কৃষিবিদরা। তারা বিভিন্ন গবেষণা, প্রযুক্তি আর তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন নতুন সব তথ্য উপস্থাপন করছেন। বিভিন্ন হাইব্রিড বীজ উত্পাদন, উত্পাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা, জৈবিক চাষ পদ্ধতি, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, জেনেটিক্যাল রিসার্চ, মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য মনোসেক্স প্রজাতি, খাঁচায় মাছ চাষ, পোলট্রি শিল্পে উত্পাদন বাড়ানো, উন্নত মানের ফিড তৈরি এসবই কৃষিবিদদের গবেষণার ফসল।’ কামরুল হাসান উদ্যানতত্ত্বে দারুণ কাজের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, হর্টিকালচার কর্মীদের উদ্ভিদ এবং বাগানবিষয়ক ব্যাপক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। সাধারণ নার্সারি থেকেও প্রচুর রোজগার করার সুযোগ রয়েছে। একজন উদ্যানবিজ্ঞানী শিল্পাঞ্চল, সরকারি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন। শস্যাদি উত্পাদন প্রকৌশলী, পাইকারি বা খুচরা ব্যবসায়ী ম্যানেজার, ফল-শাক-সবজি-ফুল-চারাগাছের টিস্যু কালচার স্পেশালিস্ট, ক্রপ পরিদর্শক বা উত্পাদন উপদেষ্টা, প্রোডাকশন, কৃষি সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ, বৃক্ষ বংশবিদ, গবেষণা বিজ্ঞানী বা শিক্ষক হিসেবে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেন।’ কামরুল হাসানের জন্ম চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক, তার অনুপ্রেরণা তাকে আজকের এই অবস্থানে আসতে অনেক সাহায্য করেছে। এক বছর হলো তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে, হয়তো ছেলের সাফল্য দূরে থেকে দেখছেন। মা একজন গৃহিণী। তিন সন্তানকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলেছেন তিনি। কামরুলের স্ত্রী নাসরিন আক্তার কাজলও একজন উদ্যানতত্ত্ববিদ। দুই সন্তান রেদওয়ান আর জারিনকে নিয়েই সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে কেটে যায় তার সারাটা দিন। দিনগুলো কৃষিতে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেই কাটছে তার। ০০০ মো. ফারুক বিন হোসেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নজরে মো. ফারুক বিন হোসেন ডাক নাম :ইয়ামিন জন্মতারখি ও স্থান :২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮০; ভান্ডারিয়া, পিরোজপুর মায়ের নাম :মিসেস ফরিদা বেগম বাবার নাম :কৃষিবিদ মো. আবুল হোসেন প্রথম স্কুল :শশীভূষণ শিশু নিকেতন, খুলনা প্রিয় মানুষ :প্রফেসর গাজী এম এ জলিল, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রিয় উক্তি :সময়কে অবহেলা করো না। যদি কর, তবে সময়ের সুদিনে সময়ই তোমাকে তাচ্ছিল্য করবে। প্রিয় পোশাক :সুতি শার্ট-জিন্স প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :স্কুল বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সাফল্যের সংজ্ঞা :জীবন, কৃতকর্ম অথবা কোনো ভাবনা যখন পৃথিবী, দেশ, জাতি এবং নিজের উপকারে আসে তাই সাফল্য। ২০০৫-০৬ সাল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র থাকাকালীন মাস্টার্সের সুপারভাইজার এবং কো-সুপারভাইজার নিজের বিভাগেরই দুজন শিক্ষক নতুন স্বপ্ন দিলেন, তাকে শিক্ষক করে তাদের কাছে রাখবেন। স্বপ্নে বিভোর, মনে মনে দিন গুনছেন, কবে মাস্টার্স শেষ হবে। এরইমধ্যে বিআরআরআই’তে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার যোগদান পত্র পেয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তার প্রিয় মানুষটির শরণাপন্ন হলেন, পেয়ে গেলেন সমাধান—‘ভবিষ্যত্ সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর না গুনে বর্তমান সুযোগের সদ্ব্যবহারই শ্রেয়’। যোগদান করলেন আঞ্চলিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্র রহমতপুরে। পড়ছিলেন প্রজন্মের মেধাবী উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. ফারুক বিন হোসেন সম্পর্কে। শৈশবে খুবই দুরন্ত ছিলেন মো. ফারুক বিন হোসেন। সবাই চোখে চোখে রাখত তাকে, কারণ ফাঁকি দিয়ে অঘটন ঘটানোই ছিল তার কাজ। তবে সবার খুব আদরের ছিলেন তিনি। জানালেন, খেলাধুলা, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক সংগঠন আর লেখাপড়া নিয়ে শৈশব বেশ আনন্দেই কেটেছে তার। যৌবনের শুরুতে রোভারিং করে জনসেবায় নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে। জানালেন, দরিদ্রদের জন্য রক্তদাতা জোগাড় করতেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে ভালোবেসে ‘রক্তচোষা’ নামে ডাকত তাকে। সেই ৬ বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করেছেন। নিজেও প্রতি চার মাস পর পর রক্ত দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়গুলো ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন, জনসেবা আর পড়াশোনা মিলিয়ে বর্ণিল এক অধ্যায়। আঞ্চলিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্র রহমতপুরে কাজ শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই কেন্দ্র প্রধানের সুনজরে পড়লেন। তিনি ১৫০ একরের খামার তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে দিলেন। দায়িত্বটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন ফারুক। শুরু হলো যোগ্যতা প্রমাণে অক্লান্ত পরিশ্রম। একদিকে উদ্যানতাত্ত্বিক গবেষণা সম্পাদন, অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়কের কঠিন দায়িত্ব। বছর খানেকের মধ্যেই কেন্দ্রে পরিবর্তনের সুবাতাস বইতে শুরু করল। তবে তা বেশি দিন টিকল না। স্বভাবসুলভ ভাবেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন দুর্নীতিবাজ আর অব্যবস্থাপনাকারীদের সাথে। টিকে থাকার লড়াই চলল তিন বছর। অতঃপর তাদের হীন আক্রমণে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলেন। তল্পিতল্পা গুটিয়ে এক বছর কুমিল্লা কেন্দ্রে কাটালেন। এরপর ২০১০ সালে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, গাজীপুরে যোগদান করেন। এ সময়গুলোতে শিখছেন শক্তি, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ নয়, কর্ম এমন এক হাতিয়ার যা দিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়া যায়। তাই গবেষণা কাজে পুরো মনোনিবেশ করলেন। বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী, নিজের ছেলে, দুই ভাই, ভাইদের বৌ এবং ছোট ভাইয়ের একটি মেয়ে নিয়ে মো. ফারুক বিন হোসেনের যৌথ পরিবার। স্ত্রী মোছা. সাদিয়া আরফিন উদ্যানতত্ত্ববিদ ও কৃষি বিজ্ঞানী। সবশেষে তার স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে ফারুক বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন আমার মনে। তবে ঘুমের মধ্যে কম স্বপ্ন দেখি, কারণ বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই দু’মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। মনের স্বপ্ন হলো, আমার একটি গবেষণাগার থাকবে। সেখানে যেকোনো মানুষ যা ইচ্ছে তাই নিয়ে গবেষণা করতে পারবে। যেমন একজন ইচ্ছে করল, চুম্বক সমেরুকে বিকর্ষণ করে, এই ধর্ম কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য জ্বালানির ব্যবহারহীন টারবাইন তৈরি করবে। আমার গবেষণাগার তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মানুষ তার স্বপ্ন নিয়ে আসবে আমরা সবাই মিলে তার বাস্তব রূপ দেব। নতুন কিছু উদ্ভাবিত হবে, দেশ এগিয়ে যাবে।’ ০০০ মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এক নজরে মো. আমিনুল ইসলাম ডাক নাম :আমিনুল জন্মতারিখ ও স্থান :৫ ফেব্রুয়ারি কেশবপুর মায়ের নাম :মোছা. হাজেরা খাতুন বাবার নাম :মৃত শামসুদ্দিন মোল্লা প্রথম স্কুল :কেশবপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রিয় মানুষ :বাবা-মা প্রিয় উক্তি :সত্যেই সুখ। প্রিয় পোশাক :ফরমাল ড্রেস অবসর কাটে যেভাবে :বইপড়া, সংবাদ দেখে ও ফেসবুকে আড্ডা। সাফল্যের সংজ্ঞা :শ্রমই সাফল্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন মো. আমিনুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। অনেক কিছুর ভিড়েও চাইতেন এটা যেন ঠিকঠাক থাকে। সময়টা বিগত শতকের শেষের দিকে, চাইছিলেন সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে। সেই মাফিক এগিয়েছিলেন অনেক দূর। এর মাঝেই সেই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকে চাকরির সুযোগ পেয়ে যান। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন সেখানে। ৫ বছর চাকরি করার পর বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে কৃষি ক্যাডারে সুযোগ পেয়ে যান। এরপর সব ভেবেচিন্তে চলে এলেন বর্তমান পেশায়। কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও কাজের ক্ষেত্র তাকে এ সিদ্ধান্ত নিতে উত্সাহিত করে। নিজের পরিবারেরই সম্প্রসারিত অংশ মনে করেন কৃষি বিভাগকে। আর এই কথা স্পষ্ট, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে শুধুই কাজের খাতিরে কাজ করা নয় মনোভাবের সাথে আন্তরিকতা যোগ করা যায়, তখন নিজের পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এমনই ভাবনায় পথ চলেছেন তিনি। যার ফলাফল একেক করে অনেকগুলো ধাপ পার করে আজ তিনি উদ্যানতত্ত্ববিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি কৃষি সম্প্রসারণের আধীন হর্টিকালচার সেন্টার, খয়েরতলা যশোরে। আমিনুল ইসলামের শৈশব-কৈশোর কেটেছে যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষের তীরে। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নিজ বাড়িতে সেইভাবে থাকা হয়নি। বাবার সাথে কপোতাক্ষের বুকে ভেসে বেড়ানো আর মাছ শিকারের কথা আর মায়ের হাতের অপূর্ব রান্নার স্বাদ এখনও তার শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। বর্তমানে স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সুখের সংসার তার। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে আমিনুল বলেন, ‘পেশা হিসেবে এই পেশা আমার মেধা ও মননে এক সুরে গাঁথা। এ কারণেই নিজের সর্বস্ব দিয়ে কাজকে আঁকড়ে পড়ে থাকি। সবুজ বৃক্ষের মাঝেই আমি প্রতিদিন নিজেকে খুঁজে পাই নতুন করে। প্রতিদিন সকাল-বিকেলে যখন আমার বাগানের মাঝ দিয়ে হাঁটি, তখন মনে হয় গাছগুলো যেন আমাকে ডেকে বলে আয় আমরা খেলা করি। আবার যখন চোখে পড়ে কোনো গাছের পাতায় পোকা লেগেছে বা রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে মনে হয় যেন আমিই আক্রান্ত। নতুন কোনো ফুল বা ফলের জাতের যদি খোঁজ পাওয়া যায় তাহলে তা নিজের বাগানে না দেখা পর্যন্ত যেন রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়। তাই তো কানাডা, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণের সময় সেসব দেশের নতুন জাতগুলোকে নিজের পকেটে পুরতে দ্বিধা হয়নি কখনও।’ নিখাদ স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কথা প্রকাশ হলো আমিনুলের ভাষায়, ‘কৃষিবিদ হিসেবে কৃষিভিত্তিক কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। হয়তো একটু চেষ্টা করলে প্রশাসন বা পুলিশ সার্ভিসের মতো পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম কিন্তু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলো-বাতাসে বড় হয়ে নিজেকে নিজের পেশার বাইরে কখনও কল্পনায় আনতে পারিনি। আর তাই সবসময়ই কৃষি ক্যাডার ছিল আমার পছন্দের শীর্ষে। ছায়াঘেরা সুনিবিড় পরিবেশ আমার কাজের পরিবেশকে করেছে মনোমুগ্ধকর। গাছের সবুজের সান্নিধ্যই মনকে রাখে প্রানবন্ত ও উচ্ছ্বাসিত। কৃষক ও কৃষকের মাঠের সজীবতায় বুক ভরে উঠে অনাবিল আনন্দে।’