জলযানের প্রকৌশলী

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৪৯
তার খুব শখ বুয়েটে ভর্তি হবেন! বগুড়া থেকে চলে এলেন ঢাকায়। তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হলেন। স্বাভাবিকভাবেই চেয়েছিলেন সেই সময়ের চাহিদায় শীর্ষে থাকা বিষয়গুলোতে পড়বেন। ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন না হলেও সুযোগ পেয়ে যান নেভাল আর্কিটেকচারে। একবার ঝোঁক হলো বিদেশেই চলে যাবেন। কিন্তু শেষটায় বুয়েটেই থেকে যাওয়া হলো তার। রফিকুল ইসলামের শুরুর কথা বলছিলাম, যিনি নিজের যোগ্যতায় আজকে সেই বিভাগেরই বিভাগীয় প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি এই সম্পর্কিত জাতীয় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকটায় রফিকুল ইসলাম হূদ্যতা শুরু নেভাল আর্কিটেকচার বিভাগের সাথে। ছেলেবেলা থেকেই যে কাজটা করেছেন শতভাগ আন্তরিকতার সাথেই করার চেষ্টা করেছেন। আর সেই ধারাবাহিকতাতেই বরাবরই প্রথম হয়ে এসেছেন বিভাগীয় পরীক্ষাগুলোতে। এই ফলাফলই তাকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে দেয়, যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। শিক্ষক থাকাকালীনই তিনি জাপান থেকে ডায়নামিকস অব মাল্টিবডি অফসোর স্ট্রাকচারের উপর পিএইচডি অর্জন করেন। এই কাজে কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে আমেরিকার ইন্টারন্যশনাল সোসাইটি অব অফসোর অ্যান্ড পোলার ইঞ্জিনিয়ারিং তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। আমাদের অনেকেরই ধারণা নেভাল আর্কিটেক্ট মানেই কেবল বিশাল বিশাল জাহাজের নকশাই করতে হবে হয়তো। এই ভুল ভাঙলেন এই প্রজন্মের মেধাবীজন রফিকুল ইসলাম। তিনি জানালেন, জাহাজের নকশা করা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বটে, এর বাইরেও এর কারিগরি দিক, কাঠামো, ম্যাটেরিয়াল নিয়ে গবেষণা, সামুদ্রিক যেকোনো স্থাপনা এমনকি নিজের পণ্যকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করানোর মতো কাজগুলোও তারা করে থাকেন। আর সেই সূত্রেই তাদের পাঠ্যসূচিও হয় বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর। এ কারণেই এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কমতি থাকে না কখনোই। রফিকুল ইসলাম মনে করেন, নেভাল আর্কিটেক্ট বা এই ধরনের সৃজনশীল কারিগরি বিষয়গুলোতে কেবল বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। এর বাইরে হাতে কলমে শেখার অনেক দিক থেকে যায়। আর শিক্ষকরাই পারে এই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে। তিনি নিজে দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে অনেক ধরনের শিখন পদ্ধতির সাথে পরিচিত হয়েছেন। এই বিষয়গুলোও নিয়মিত তরুণ শিক্ষকদের মাঝে পরিচিত করানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নেভাল আর্কিটেক্ট পেশা হিসেবে কেমন সেটা আর এই সময়ে নতুন করে বলার অবকাশ নেই। এরপরও রফিকুল ইসলাম মনে করেন, দেশের বাইরে প্রচুর চাহিদার সাথে সাথে আমাদের দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে আরও ফলপ্রসূ হবে। শিক্ষিতদের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। আমেরিকাসহ ইউরোপের অনেক দেশেই নেভাল আর্কিটেক্টদের কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। আমাদের আশপাশের অনেক দেশেও বাংলাদেশের অনেক নেভাল আর্কিটেক্ট কাজ করছে, তাদের মূল্যায়নও সর্বত্র ব্যাপক। তবে আমরা চাইলে আমাদের দেশেই এই শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারি। ইতোমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে দেশেই উন্নত প্রযুক্তির কাজ সম্ভব। একইসাথে এই পথ ধরে বাইরের দেশ থেকে আমাদের কাজের সুযোগ এনে সেটার সদ্ব্যবহার করতে হবে। বিশ্বের পুরো বাজারের দুই শতাংশ ধরতে পারলেও আমাদের জন্য সেটা বিরাট পাওনা, এখন যা হচ্ছে সেটা খুবই সীমিত পরিসরে, জানালেন তিনি। জাহাজ নির্মাণ শিল্প ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ শিল্প বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য শিল্পে পরিণত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্প রাখছে মূখ্য ভূমিকা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সেই দিন বেশি দূরে নয় বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তবে এ শিল্পকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সব মহল থেকেই সহযোগিতা দরকার বলে মন্তব্য রফিকুল ইসলামের। নতুনদের এই পেশায় স্বাগত জানিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অফুরন্ত সম্ভাবনার একটা পেশা নেভাল আর্কিটেকচার ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং। দেশ ও দেশের বাইরেও কাজের প্রচুর সুযোগ রয়েছে, এটাকে কাজে লাগালেই আমরা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারব। সময় এখন, এই সম্ভাবনা আর আমাদের সামর্থ্যের কথা বিশ্বদরবারে জানানো। নিজেদের কাজকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারলেই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কম এলেও তাদের সুযোগ কম নয় বলে জানালেন তিনি। মেয়েরাও আন্তরিকতার সাথে এই পেশায় কাজ করছেন অনেকেই। আর এতদিন বুয়েটের পাশাপাশি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতেও এই বিভাগ খোলায় পড়ার সুযোগ বাড়ল। সেই সাথে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরের দুয়ার তো খোলা থাকছেই। কাজেই তরুণরা যতই আসবে, ততই সমৃদ্ধ হবে এই পেশা।’ রফিকুল ইসলামের ছেলেবেলা কেটেছে বগুড়াতে। মাঝে কিছুদিন ঢাকায় থাকলেও বগুড়া ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজেই কেটে গেছে শৈশবের আনন্দের দিনগুলো। সেই সময়ের কাজী আব্দুর রশীদ আর সায়েদুল ইসলাম স্যারের কথা তিনি এখনও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেন। পড়াশোনাতেই আনন্দের বড় একটা জগতের সাথে তাকে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই। এরপরও তো দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ বুয়েটেই পদচারণা। দুই ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়েই তার সুখের দিন কাটে এখন। বিদেশ বিভূঁইয়ে অনেকবার আহ্বান পেলেও এই কাদামাটি ছেড়ে চলে যেতে মন সায় দেয়নি কখনও তাদের। স্ত্রী আলমিনা পারভীন মুক্তিও তার এই পথচলায় বড় অনুপ্রেরণা। মেয়ে আনিকা তাহসিন মায়েশা আর ছেলে আদিল আহনাফ দিহান এখনও স্কুলে পড়ছে। বাবার সাথে প্রায়ই ঘুরতে বের হয় তারা, কতই না প্রশ্ন ক্ষুদে এই প্রজন্মের! সেই সময় আর এই সময়ের ফারাকটা বুঝতে পারলেও নিজেকে এখনও তারুণ্যের কাতারে সামিল রাখতে চান তিনি। ড. এম রফিকুল ইসলাম ডাকনাম :রফিক জন্মতারিখ ও স্থান :১৯ মার্চ, সিরাজগঞ্জ মায়ের নাম :রিজিয়া খাতুন বাবার নাম :মোহাম্মদ মোকছেদ আলী মিয়া প্রথম স্কুল :কাঞ্চনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগুড়া প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট প্রিয় উক্তি :স্লো অ্যান্ড স্টেডি উইনস দ্য রেস প্রিয় মানুষ :বাবা অবসর কাটে যেভাবে :অলস দুপুরে একাকী সাফল্যের সংজ্ঞা :বিষয়টা আপেক্ষিক, চেষ্টা করে গেলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করা যায়। ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু