শৈশবে খুব দুরন্ত ছিল ছেলেটি। স্কুল থেকে এসেই দুপুরের রোদে বেরিয়ে পড়ত ঘুড়ি উড়াতে। বিকালে গ্রামময় ঘুরে বেড়াত একদল দুষ্টু ছেলের সাথে, কখনোবা জাম্বুরা নিয়ে মেতে উঠত ফুটবল খেলায়। শীতের সন্ধ্যায় অন্যের খেজুর গাছের রস চুরি করেও খেয়েছে অনেক। এতকিছুর পরেও সে ছিল পড়াশোনাতে মনোযোগী। যত রাতই হোক, নির্ধারিত পাঠ শেষ হওয়ার পরই ঘুমুতে যেত। যে নিয়মশৃঙ্খলার কারণে আজ এ সফলতা, তার চর্চাটা সেই শৈশবেই শুরু। গল্পের সেই ছেলেটি এ প্রজন্মের মেধাবী ব্যাংকার মো. মশিউর রহমান।
মো. মশিউর রহমানের জন্ম যশোরের বহরমপুরে। গ্রামেই কেটেছে তার ছেলেবেলা। সেখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার হাতেখড়ি। ছাতিয়ানতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর সুযোগ করে নেন যশোরের স্বনামধন্য সরকারি এম এম কলেজ। সেখান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন সফলতার সাথে। খুলনা সরকারি বিএল কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেই সুযোগ পান এবি ব্যাংকে। সহকারী অফিসার হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু। একাধিকবার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট থেকে। এবি ব্যাংকের ট্রেনিং একাডেমি থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন গুণী এই ব্যাংকার।
প্রজন্মের মেধাবী ব্যাংকার মশিউর রহমান তার কর্মজীবন শুরু করেন এবি ব্যাংকের সহকারী অফিসার হিসেবে। সময়টা আশির দশকের শেষের দিকে। তখন ব্যাংকে চাকরি রীতিমতো সোনার হরিণ। মশিউরের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের প্রতি ভালোবাসা আর নিয়মশৃঙ্খলাই অল্প সময়ের মধ্যে তাকে সফলতা এনে দেয়। কয়েক বছরের মধ্যেই পদোন্নতি পেয়ে হয়ে যান অফিসার। আর এ ধাপগুলো পার করে আজ দেশের প্রথম সারির একটি ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এ অবস্থানে আসার পেছনে নিজের যোগ্যতা আর মেধার পাশাপাশি স্ত্রী ও সহকর্মীদের সহযোগিতাও অনেক অবদান রেখেছে বলে জানান তিনি। মশিউরের কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম ব্যাংকিংয়ের প্রতি তার কেন এত আগ্রহ? জবাবে তিনি বলেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই ব্যাংকের কাজের প্রতি আগ্রহ ছিল। আর সেখানকার সুন্দর পরিবেশও তাকে অনেক আকৃষ্ট করে। তা ছাড়া ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে অনেক পেশার অনেক মানুষের সাথে পরিচয়ের সুযোগ হয়। আর পথ চলতে অনেক বাধা তো আসবেই, কিন্তু এসব পার হয়েই এগিয়ে যেতে হয়।’
নতুনদের ব্যাংকিং পেশায় স্বাগত জানিয়ে এবি ব্যাংক লিমিটেডের এই অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম অনেক ভালো করছে ব্যাংকিংয়ে। তারা যত মেধা নিয়ে এগিয়ে আসবে, আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর আরও বেশি সমৃদ্ধ হবে। তাদের চিন্তা-চেতনা অনেক উদ্ভাবনী, কাজের ধরনও সৃজনশীল। সেই সাথে আরও একটা বিষয় হচ্ছে, তরুণরা অনেক জেনেশুনে এ পেশায় আসছে। যেকোনো পেশায় সফল হওয়ার জন্য যেটা অনেক জরুরি।’ পরামর্শ হিসেবে এই ব্যাংকার নতুনদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ যেমন দরকার, সেই সাথে ধৈর্য ধরে কোনো কাজ শেখা উচিত। স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। তবে সেটা যেন অলীক না হয়। কেবল পদোন্নতির কথা ভাবলেই চলবে না। নিজের যোগ্যতা আর মেধা দিয়ে কাজ করে গেলে সফলতা এমনিতেই আসবে। কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে গ্রহণ করা উচিত। সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের কাছ থেকে শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। সবার উপরে দরকার নিজের ব্যাংকের সাথে একটি আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করা। সেটা করতে পারলে অন্য বিষয়গুলো আপনাআপনি হয়ে যাবে।’
ব্যাংকিংয়ে আমাদের দেশ অদূর ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে। এমনটাই মনে করেন মশিউর রহমান। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যাংকিংকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। তিনি ব্যাংকিংকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এ মিছিলে সম্পৃক্ত থাকতে চান সবসময়। ঢাকার পূর্ব তেজতুরী বাজারে স্ত্রী, সন্তান আর মা’কে নিয়ে মশিউরের আপন নিবাস। স্ত্রী শরিফা রহমান গৃহিণী, কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে সবসময়ই স্ত্রী তার পাশে থাকেন বলে জানান তিনি। তার ছেলে সাকিব পড়ছে ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে। মেয়ে রায়া এবার চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ছে বটমলি হোমস বালিকা বিদ্যালয়ে। অবসরে গান শুনতে শুনতে মশিউর হারিয়ে যান আপন কোনো জগতে, সেখানে বসেই তিনি স্বপ্ন দেখেন তার সন্তানের একদিন মানুষের মতো মানুষ হবে, তাদের সফলতা ছুঁয়ে যাবে তাকে। নিজের জন্য তার আর খুব বেশি চাওয়া নেই, শুধু মানুষের উপকারে পাশে থাকতে চান সবসময়।
