খুলনা সিটি নির্বাচনে (কেসিসি) আওয়ামী নেতা তালুকদার আব্দুুল খালেকের পরাজয়ের পর পাল্টে গেছে নগরীর চিত্র। যে লোকটি কোন নির্বাচনে আজ পর্যন্ত হারেননি, তার এই বিপর্যয় নিয়ে চলছে চুলচেলা বিশ্লেষণ। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় ইস্যুর প্রভাব পড়েছে এবারের এই নির্বাচনে। পরাজয়ের কারণ হিসাবে জাতীয়ভাবে সরকারের নানা ধরনের কর্মকাণ্ড, দলের সহযোগিতা না পাওয়া, বিগত সাড়ে চার বছরে নগরীর মেয়র থাকাকালীন বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার আচার-ব্যবহারকেও দায়ী করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে পর পর তিনবার বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মংলা) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তালুকদার আব্দুল খালেক। নির্বাচনে তাকে সমর্থন দেয়া সম্মিলিত নাগরিক কমিটির চেয়ারম্যান সাবেক স্পিকার ও বিএনপি নেতা শেখ রাজ্জাক আলী এই পরাজয়ের পেছনে তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, তার (খালেক) পরাজয়ের কারণগুলো হচ্ছে দেশের সার্বিক রাজনীতি, দলের সহযোগিতা না পাওয়া এবং তার আচার-ব্যবহারে মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া। তিনি মনে করেন, প্রথমত, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মানুষের মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সিটি নির্বাচনে। অথচ তিনি মেয়র থাকাকালে খুলনার উন্নয়নে বেশ কাজ করেছেন। আমি তাকে (খালেক) সমর্থন দিয়েছিলাম এই কারণে। কিন্তু নির্বাচনে এই কাজের কোন প্রভাব পড়েনি। মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়েই সরকারের বিরুদ্ধে এই রায় দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এমপি থাকাকালে তার একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে সিটি মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ক্রমেই তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েন। কেসিসি’র কর্মচারী ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীকে মারধর ও রূঢ় ব্যবহারের কারণে খুলনা সিটির সিংহভাগ কর্মচারীর বিরাগভাজন হন তিনি। কেসিসি’র টেন্ডার বিতরণের ক্ষেত্রে তার পছন্দের লোকদের অধিক সুবিধা প্রদানের কারণে ঠিকাদারদের মাঝেও ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এছাড়া গতকয়েক বছরে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যাওয়ায় তার আয়ের উত্স নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তাছাড়া ২০০৮ সালে নির্বাচিত দলীয় কাউন্সিলররা সুবিধা না পাওয়ায় বেশিরভাগই ভিতরে ভিতরে তার বিরোধিতা করেছেন বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন। দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের অনেকেই তালুকদার আব্দুুল খালেকের পক্ষে কাজ করেননি। অবশ্য পরে দলের কেন্দ্রীয় অনেক হেভিওয়েট নেতা খুলনায় এসে তার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
এদিকে দলের কোন সিনিয়র নেতাকে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রধান না করে সাবেক বিএনপি নেতা শেখ রাজ্জাক আলীকে করার বিষয়টিও দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের কারণ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে বিভিন্ন ব্যানারে তালুকদার খালেকের নানা অনাচার, অত্যাচার এবং ঢাকায় হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশে পুলিশের গুলি, রক্তাক্ত লাশের ছবিসহ লিফলেট বাসায় বাসায় বিলি করা হয়। নগরীর একটি বাজারের এক দোকনীকে চড় মারার ছবিও প্রকাশ করা হয় ফেসবুকে। এ সমস্ত বিষয় সাধারণ ভোটারদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় তাকে হারতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তালুকদার খালেকের পরাজয়ের বিষয়ে নাগরিক কমিটির কো-চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট এনায়েত আলী বলেন, তালুকদার খালেকের উপর মানুষ যতটা না রুষ্ট তার চেয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডে মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নির্বাচনে। সারাদেশে এখনই যদি কোন নির্বাচন হয় তাহলে বর্তমান সরকারের চরম ভরাডুবি ঘটবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
