তিন কারণে হারলেন হিরন

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২৩:১৪
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিবেচনায় গত পাঁচ বছরে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে নানা মহলের কাছে। এ সাফল্যের রূপকার সদ্য বিদায়ী মেয়র শওকত হোসেন হিরন, যিনি গত শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হেরে গেলেন দেশের পর্যবেক্ষক মহল ও তার শুভানুধ্যায়ীদের অবাক করে দিয়ে। হিরন কেন হারলেন—এ প্রশ্নের জবাবে মোটা দাগে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। ১. জাতীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব, ২. নিজ দলের শতভাগ সহযোগিতার অভাব এবং ৩. অস্বচ্ছ উন্নয়ন তত্পরতা। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ইস্যুতে দেশব্যাপী সরকার যে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, সেই প্রতিকূলতারই প্রভাব পড়েছে সিটি নির্বাচনে। হেফাজতে ইসলাম, পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি, রেল মন্ত্রণালয় ইত্যাদি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রভৃতি ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিরোধী দল যে কথা বলে যাচ্ছে তারই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে বরিশালের নির্বাচনে ১৮ দলীয় নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে। বরিশাল বিএনপির ঘাঁটি, এখানে এমপি বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার। যদিও নগরীতে তার ভোট আওয়ামী লীগের চেয়ে কম। কিন্তু সরোয়ার দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে দলীয় প্রার্থী আহসান হাবিব কামালকে বিজয়ী করতে কামাল বিদ্বেষী অতীত মনোভাব বুকে চাপা দিয়ে সক্রিয় ছিলেন, যেন সরোয়ার নিজেই প্রার্থী। তার সকল অনুসারী তথা আওয়ামী বিরোধী ভোটারদের তিনি কামালের পক্ষে এবং হিরনের বিপক্ষে ভোট দেয়াতে সক্ষম হয়েছেন। শওকত হোসেন হিরন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বরিশাল মহানগর প্রধান এক যুগ ধরে। তিনি এখানে দীর্ঘদিন আহবায়ক এবং এ বছরের গোড়ায় দলীয় কাউন্সিলে সভাপতির পদ লাভ করেন। ভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগের যোগদানকারী হিরন প্রথমে সংগঠনকে বরিশালে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে না পারলেও পাঁচ বছর আগে মেয়র হয়ে যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দেন, দলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। তবে আওয়ামী লীগের শতভাগ ভোট পক্ষে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন শওকত হোসেন হিরন। জাসদ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি-আওয়ামী লীগ—এ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় বিকশিত হিরন আওয়ামী লীগের মূলধারায় অর্থাত্ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর ‘নেক নজরে’ ছিলেন না। এ কারণে ভোটের লড়াইয়ে দলের নেতা-কর্মীদের সবাইকে পাশে পাননি হিরন। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রধান হয়েও তিনি একটি নিজস্ব ভাবধারা বরিশালে ও দলে সৃষ্টি করতে গিয়ে পুরোনো আওয়ামী লীগার ও তাদের অনুসারীদের বিরাগভাজন হন। বিএম কলেজ ছাত্রলীগকে ঢেলে সাজাতে নেতৃত্বে আনা অনুগতদের নিয়ে অস্থায়ী কর্মপরিষদ নামে ছাত্র সংসদের একটি সমান্তরাল সংগঠন দাঁড় করানো হয়। কলেজের দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক কাজে এদের সংশ্লিষ্ট করে আর্থিক সুবিধা লাভের সুযোগ দান ও কলেজ অধ্যক্ষ শংকর চন্দ্র দত্তকে যোগদানের দিন বেদম মারধর করে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনা হিরনকে ব্যাপক সমালোচিত করে। অনেকের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নির্বাচনে। সিটি কর্পোরেশন কেন্দ্রিক উন্নয়ন কাজে হিরন পরিপূর্ণ স্বচ্ছ ছিলেন না—এমন ধারণা মহানগরবাসীর একাংশের মধ্যে ভোটের আগে আলোচনায় আসে। এখানে তিনি নিজের পছন্দসই লোকজন দিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ঠিকাদারী কার্যক্রম চালাতে গিয়ে দলের কাছ থেকে দূরে সরে যান। মহানগর যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন অনেকটা হিরনের প্রতি প্রতিবাদী হয়ে। তিনি নিজে ভোট পেয়েছেন মাত্র ১৮০৭। এ ভোট তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের হলেও মাঠে জনসংযোগ কালে সিটি কর্পোরেশনে হিরনের পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় উচ্চকিত ছিলেন। হিরন সম্পর্কে তা ভোটারদের মনে বিরূপ ধারণার জন্ম দেয়। তারপরও হিরন ৬৬ হাজার ৭৪১ ভোট পেয়েছেন। যা গত নির্বাচনে তার প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে ২০ হাজার বেশি। নিজ দল ক্ষমতাসীন থাকার সুযোগ যেমন হিরনকে সুবিধা দিয়েছে, তেমনি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যবধানের কারণে অসন্তুষ্ট নগরবাসী তাকে নিরাশ করেছে। নাগরিক সেবা থেকে পিছিয়ে থাকা আধাগ্রাম-আধা শহরের ভোটাররা হিরনের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ নগরীর উন্নয়নে তিনি যে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, সে তুলনায় বর্ধিত এলাকা ছিলো অনেকটা অবহেলিত। এদিকে বরিশাল সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই নিজ দলের চির প্রতিদ্বন্দ্বী মজিবর রহমান সরোয়ার এমপি’র কাছে আত্মসমর্পণ করা আহসান হাবিব কামাল শেষ পর্যন্ত সরোয়ারকেই পুঁজি করে বিজয়ী হন বলে নগরবাসী মনে করেন। প্রথমে বিএনপি’র হাইকমান্ড দেশের চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে যে একমত ছিলেন তা নয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচন করার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সরোয়ারকে বরিশালের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে এবং মেয়র প্রার্থী হিসেবে অতি আত্মবিশ্বাসী শওকত হোসেন হিরনের দুর্বল দিককে মোকাবেলা করে ঝানু নির্বাচন কৌশলী এমপি সরোয়ার তার কর্মীবাহিনী ও অনুসারীদের নিয়ে শেষ পর্যন্ত কামালকে বিজয়ী করে তার জাতীয় নির্বাচনের পথকে অনেকটা কন্টকমুক্ত করলেন।