১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল এবং খুলনার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। এই নির্বাচনে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনের জন্য একজন মেয়র এবং প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী নির্ধারিত ওয়ার্ডের সমান সংখ্যক কাউন্সিলরও নির্বাচিত হলেন। সিটি কর্পোরেশনে এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যক সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলরও থাকেন, যদিও সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলরগণ নির্বাচিত হন কাউন্সিলরদের ভোটে। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেন। সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ ৫ বছর। বাংলাদেশের প্রধান শহরকে কেন্দ্র করে সিটি কর্পোরেশনগুলো গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মোট ১১টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। এগুলো হলো ঢাকায় দু’টি (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ), চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও গাজীপুর। শহরভিত্তিক স্থানীয় সরকার কাঠামোর সবচেয়ে উপরের স্তরটিই সিটি কর্পোরেশন। উপরোল্লিখিত প্রধান প্রধান ১১টি শহরের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা অপরিসীম। আর শহর এলাকায় যেহেতু শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ বেশি তাই শহরের মানুষ রাজনৈতিকভাবে অধিকতর সচেতন। জাতীয় রাজনীতির সকল সফলতা আর ব্যর্থতা শহরে বসবাসকারী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রভাবিত করে। শহরের মানুষ রাজনৈতিক মূল্যায়নে অধিকতর তত্পর থাকেন। আর শহুরে মানুষের রাজনৈতিক মত গ্রামের মানুষকেও নাড়া দিতে পারে। এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনীতিতে সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্ব খানিকটা তুলে ধরা। যদিও আইনগতভাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে এই নির্বাচনও দলীয়ভাবেই হয়।
যাহোক ১৫ জুনের নির্বাচনে চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দল সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করেছে। এই জয়লাভকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ‘দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে’—এই রাজনৈতিক অবস্থানের বিজয় হিসেবে দেখলেও এই ফলাফল বাস্তবিকভাবেই আগামী ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বিএনপির জন্য এই জয় দীর্ঘদিন যাবত্ দলটির যে সাংগঠনিক খরা চলছিল, সেই খরা থেকে উদ্ধার পেতে যথেষ্ট প্রাণসঞ্চারে সহায়ক হবে সন্দেহ নেই।
নির্বাচনের আগে সম্ভবত কোন বিশ্লেষকের বিশ্লেষণেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের এহেন পরাজয়ের বিষয়টি উঠে আসেনি। অনেকেই ভেবেছিলেন এবং অনেকের মত আমিও ভেবেছিলাম, সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে এ সরকারের সময়ে উন্নয়নের যে ছোঁয়া লেগেছে তাতে করে অন্তত ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীরা কমপক্ষে দু’টো আসনে জিতবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটনা ঘটলো উল্টো। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় প্রার্থী খুলনায় বিএনপি প্রার্থীর কাছে ৬০,৬৭১, রাজশাহীতে ৪৭,৩৩২, বরিশালে ১৭,০১০ এবং সিলেটে ৩৫,১০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এই অবস্থায় সকলের কাছে প্রশ্ন কেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রার্থীদের এই পরাজয়? ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীর জয় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কী প্রভাবিত করবে? ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কী এর হারানো ইমেজ ফিরে পাবে, যা দলটিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভে সহায়তা করবে?
১৮ দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের পেছনে কার্যকর উপাদানগুলোকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত: জাতীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা। যেমন: হলমার্ক দুর্নীতি, পদ্মা সেতু কেলেংকারি, শেয়ার বাজারে ধস, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তত্পরতা—এসকল বিষয়ে জনমনে আওয়ামী লীগের সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাকে প্রমাণ করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াতের সাথে সরকারের কঠোর আচরণ এবং সর্বোপরি হেফাজতে ইসলামকে দমনের সরকারি উদ্যোগ, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্মভীরু ভোটারদেরকে প্রভাবিত করেছে এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায়। চারটি সিটি কর্পোরেশনে জামায়াত ৬টি কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করেছে। এ থেকে এ সিটি কর্পোরেশনগুলোতে জামায়াতের ভোট ব্যাংক সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবেই চারটি সিটি কর্পোরেশন এলাকায়ই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারণায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো মরিয়া হয়ে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। আমি মনে করি বিএনপি এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সাথে সরকারের কঠোর আচরণ ১৮ দলীয় জোটকে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় অধিকতর সংগঠিতভাবে কাজ করতে উত্সাহিত করেছে। তবে আমার মনে হয়, জাতীয় রাজনীতির বিষয়গুলো দলের ভোটারদের চেয়ে সুয়িং (swing) ভোটারদেরকে অধিকতর প্রভাবিত করেছে।
সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বিজয়ী ১৮ দল নেতৃত্বাধীন বিএনপি’র এই জয় তার দলের নেতা-কর্মীদের নৈতিক মনোবল বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে বিএনপি তার সাংগঠনিক দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে ধারণা করা যায়। তবে জাতীয় নির্বাচন প্রাক্কালে অবশ্যই বিএনপি’কে জাতীয় সমস্যা সমাধানে তার দলের policy guideline তুলে ধরতে হবে, যা হতে হবে অবশ্যই আওয়ামী লীগের চেয়ে উন্নততর। জাতীয় নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগের সমালোচনা করাটাই যথেষ্ট নয়, বরং দুর্নীতি, বিদ্যুত্, গ্যাস সংকট এবং ভারতের সাথে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানের Roadmap দেখাতে হবে।
ক্ষমতাসীন দল হিসেবে অনেক উন্নয়ন কাজ করা সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। তবে জাতীয়ভাবে দুর্নীতি রোধ, জ্বালানি সংকট নিরসন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আওয়ামী লীগ, বিএনপি থেকে মৌলিক কোন পরিবর্তন জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। তাই আওয়ামী লীগের জন্য এখন প্রয়োজন সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা।
আওয়ামী লীগের জন্য এখন দরকার হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে অধিকতর সহনীয় আচরণের রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ। প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্যাতনের মাধ্যমে দমনের কৌশলে না গিয়ে জনগণের সামনে তার অর্জন ও ব্যর্থতাগুলোকে দ্বিধাহীনভাবে তুলে ধরা উচিত এবং ব্যর্থ জায়গাগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো জরুরি। তাই আমার শেষ কথা হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি’র বিজয় জাতীয় নির্বাচনে বিজয় নাও হতে পারে, যদি বিএনপি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক নীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো কিছু দেয়ার বাস্তবসম্মত পথ জাতিকে না দেখায়। আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে জিততেও পারে যদি আওয়ামী লীগ তার কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক নীতির ভাল দিকগুলোকে ছাপিয়ে আরও ভাল কিছু করার বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Email: [email protected]
