এমন এক সময় ছিল যখন কর্ণফুলি নদীর বুক জুড়ে চলতো হাজার হাজার নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত বোট। এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো হাজার জেলে পরিবার। স্বচ্ছ পানির জলাধার কর্ণফুলি নদী হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন বর্জ্যে দূষিত হয়ে। লুসাই পাহাড়ে জন্ম এই কর্ণফুলি নদী সর্বগ্রাসী দূষণে ব্যবহার অনুপযোগী এখন। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কর্ণফুলি পেপার মিল থেকে নদীতে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য অপরিশোধিতভাবে ফেলা হচ্ছে। ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলি নদীর পানি এতই বিষাক্ত হয়েছে যে প্রায় ৫৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই নদীর শাখা-প্রশাখাগুলোতে চিংড়ির যে প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া ছিল তা সমূলে ধ্বংস হয়ে গেছে। দুই তীরের হাজার মত্স্যজীবী এখন কর্মহীন। সড়কপথে মালামাল পরিবহন ব্যয় বেশি হাওয়ায় তখন নদীপথে মালামাল আনা-নেওয়া হতো। কর্নফুলি নদী ক্রমাগত দখল, পাহাড় ধস এবং পলিতে ভরাট হওয়ায় নদীপথে চাকতাই খাতুনগঞ্জের মালামাল আর সহজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন হয় না। নদীপথে গ্রামাঞ্চলের শাকসবজি, তরিতরকারি ও ফলমূল পরিবহন না করার কারণে উত্পাদন খরচও বেড়েছে। মানবসৃষ্ট শহরের নিঃসরণকৃত বর্জ্য, বিভিন্ন মিল-কারখানা, গামের্ন্টসশিল্পের সিনথেটিক পর্দাথ, কালার মিশ্রণের বর্জ্য, বিভিন্ন রাসায়নিক পর্দাথ অপরিশোধিতভাবে সরাসরি নদীতে নিক্ষেপে ঘটছে পরিবেশ বির্পযয় আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। নদী তীরবর্তী লোকদের নদীর পানি ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েছে।
পরিবেশবাদীরা কুম্ভকর্ণের মতো গভীর ঘুমে অচেতন। বর্তমানে শাহআমানত সেতুর (নতুন ব্রিজ /তৃতীয় সেতু) স্থায়ী পিলার গাঁথুনির কারণে পলি দ্রুত জমে এই নদীর নাব্যতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ঠিক রাখার পরামর্শও দিয়েছিলেন। ড্রেজিং-এর জন্য পনেরো বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ না দেখার সম্ভাবনা শতভাগ। দুই দশক ধরে ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর নামেই হয়েছে নদীর দুই পাড় ভরাট ও দখল। নদীজুড়ে জেগে উঠছে চর— এ চরের বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে নিচ্ছে নদীখেকো ভূমিদস্যুরা। প্রশাসনের উদাসীনতায় কর্ণফুলি নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বিস্তীর্ণ এলাকায় জেগে ওঠা চর দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ভূমিদস্যুরা। কর্ণফুলি নদীর পাড় বিশেষ করে পশ্চিম পটিয়া, বোয়ালখালি তীরাংশে অব্যাহত ভাঙন, দু’তীরে ভূমিদস্যুদের দখল প্রতিযোগিতা, বর্ষাকালে পাহাড় ধসে পড়া কর্ণফুলি নদীর নাব্যতা কমার প্রধান কারণ।
কর্ণফুলি তৃতীয় সেতুর স্থায়ী পিলার সেতু হিসেবে নির্মাণকালে বিশেষজ্ঞরা কর্ণফুলি নদীর নাব্যতা ঠিক রাখতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০১২ সালে জরিপ সূত্রে দেখা গেছে, এ নদীর গড় গভীরতা ছিল ৩-২২ মিটার, যা বন্দর এলাকায় ছিল ১১-১২ মিটার। গঠনের দিক থেকে দেশের অন্যান্য নদীর চেয়ে ভিন্নতর হওয়ায় কর্ণফুলি নদীর কোথাও কোথাও ৩৫.০৫ ডিগ্রি আনুভূমিক রয়েছে। এটি এমনভাবেই উজানে ২০ কিলোমিটারের বেশি অতিক্রম করতে পারে না। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পলি মাটি ক্রমশ নদীর নাব্যতা কমিয়ে ফেলে। একইসঙ্গে কালুরঘাট থেকে নদীর মোহনা পর্যন্ত থাকা ২০টি প্রায় ডুবন্ত চর হুমকি হয়ে উঠেছে এ নদীর জন্য। নদী ভরাটের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরীতে আগামীতে জলাবদ্ধতার মারাত্মক ঝুঁকিও বাড়বে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর নামে কর্ণফুলি নদী অঘোষিতভাবে ভরাট করা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর। নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ২০১১ সালের ৫ জুলাই ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর কাজ শুরু হয়। ছয় শ দিনের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৭৫ শতাংশ। ড্রেজিং এলাকায় গেলে দেখা যাবে নদীর পাড়ের বিশাল অংশজুড়ে যেখানে চর পড়েছিল (চাকতাই, খাতুনগঞ্জ, ব্রিজঘাট, ফিশারিঘাট, অভয়মিত্রঘাট, সদরঘাট এবং শহরের পুরো এলাকা) সেখানেই ফেলা হচ্ছে ড্রেজিং-এর মাধ্যমে উত্তোলনকৃত মাটি। এভাবে নদীর তীর ভরাট করতে করতে অগ্রসর হওয়ায় ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে নদীর গভীরতা ও দুই পাড়ের প্রশস্ততা।
ড্রেজিং-এর মাধ্যমে উত্তোলনকৃত মাটির বিশাল অংশ যাচ্ছে ইটভাটায়। শুধু এ মাটিকে কেন্দ্র করে বাকলিয়া এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন গড়ে তুলেছে একটি অটো ব্রিকস কারখানা। যদিও কথা ছিল নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ সড়কেই যাবে উত্তোলনকৃত মাটি। চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের নামে নদী ভরাট উত্সব চলছে, যদিও এই সড়ক কয় শ বছরে নির্মাণ হবে কে জানে? তবে আর্থিক লাভের আশায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তোলনকৃত মাটি এবং বালি বিক্রি করে দিচ্ছে অন্যত্র। অভিযোগ উঠেছে, নদী ভরাটের মাধ্যমে জেগে ওঠা বিশাল ভূখণ্ডকে ঘিরে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ করতে চাচ্ছে একটি মহল। একইসঙ্গে অবৈধ দখলে নিয়ে এ ভূমিতেই শুরু করতে চাচ্ছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। ড্রেজিং-এর মাধ্যমে কর্ণফুলি নদীর নাব্যতা (গভীরতা ও দুই পাড়ের প্রশস্ততা) বৃদ্ধি পেলে নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে কর্ণফুলি নদী। কিন্তু অপরিকল্পিত ড্রেজিং নগরীর জলাবদ্ধতা আরো বাড়িয়ে দেবে। চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহাম্মদ মুহসীন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও কর্ণফুলি নদীর গবেষক ইদ্রিস আলী সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া তথ্যানুসারে কর্ণফুলি শাহআমানত সেতু থেকে সদরঘাট পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ লাখ ঘনমিটার পলি মাটি বা বালি আকারে জমেছিল কর্ণফুলি নদীতে। এখন ড্রেজিং-এর কারণে মাটি নড়াচড়া হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে মাটি বসে যাবে। যদি ড্রেজিংটা চলমান প্রক্রিয়া হতো তাহলে নদীর নাব্যতা নিয়ে কোনো সমস্যা হতো না। এ নদী পাহাড় ধসের মাটি বহন করে তাই নাব্যতা ঠিক থাকে না। একইসঙ্গে নদীর ভেতরে ওয়াকওয়ে তৈরি করার কারণে সরু হচ্ছে নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা। ফলে চট্টগ্রাম শহর যখন প্লাবিত হবে তখন এই নদী পানি ধারণ করে রাখতে পারবে না। তাঁরা ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর আগে নদীর সীমানা যথাযথভাবে পুনরুদ্ধারের বিশেষ দাবি জানান। কর্ণফুলি নদীর ড্রেজিং প্রকল্প পরিচালক খাদেমুল বাশার-এর দেওয়া তথ্যানুসারে, বুয়েট কনসালটেন্টদের নকশা অনুযায়ী চলছে ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ। যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই ড্রেজিং সংশ্লিষ্টদের। প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, তাঁরা যেভাবে বলেছেন আমরা সেভাবেই কাজ করছি। বুয়েটের অধ্যাপক মো. আতাউর রহমানের দেওয়া তথ্যানুসারে গাণিতিক মডেল স্টাডি করে কর্ণফুলি নদীর প্রকল্প এলাকার কোথায় কী করতে হবে তার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সদরঘাট থেকে তৃতীয় কর্ণফুলি সেতু পর্যন্ত নদীকে নয়টি অঞ্চলে ভাগ করে প্রকল্পের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকায় গড়ে নদীর প্রশস্ততা ছিল ৬৪৫ মিটার। খনন কাজ শেষ হলে নদীর গড় প্রশস্ততা বাড়বে ৭৭৫ মিটার। প্রকল্পের বড় অংশ ৩৬ মিলিয়ন ঘন মিটার খনন কাজের মধ্যে শেষ হয়েছে সাড়ে ১৬ মিলিয়ন ঘনমিটার খনন কাজ। এখনো বাকি রয়েছে সাড়ে ১৯ মিলিয়ন ঘনমিটার এলাকার খনন কাজ। অর্থাত্ ৫৪ শতাংশ খনন কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ২৬১৫ মিটার তীর রক্ষা কাজের মধ্যে ১৬০০ মিটার এলাকায় রক্ষাবাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই অংশে ৩৮ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। এতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শত কথার এক কথা হলো এই মুহূর্তে ঠেকাতে হবে নদীখেকোদের দখল প্রক্রিয়া। শিল্প বর্জ্যের ভাগাড় হিসেবে কর্ণফুলিকে যাতে ব্যবহার না করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই কেবল ঠেকাতে পারবে নদী খননের নামে কর্ণফুলি নদী ভরাট বা দখলের এই ভয়াবহ প্রক্রিয়া।
চট্টগ্রাম
