বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের কর্তব্য থেকে আমরা ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছি। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্যই জনগণ অকাতরে রক্ত দিয়েছে। রাষ্ট্রকে অগণতান্ত্রিক রেখে ‘নির্বাচন’ করে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম হয় না এই মৌলিক প্রশ্নটি জনগণ গভীরভাবেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান, আইন, প্রশাসন ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রণয়নের রাজনীতির পরিবর্তে সমগ্র রাজনীতি আবর্তিত হয় নির্বাচন ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে।
বিদ্যমান নবম সংসদ গঠিত হয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। প্রধান উপদেষ্টা এবং অপর অনধিক ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে নির্দলীয় সরকার গঠিত হওয়ার বিধান ছিল। উপদেষ্টাদের নিয়োগের অন্যতম শর্ত ছিলো “কোন রাজনৈতিক দল অথবা কোন রাজনৈতিক দলের সহিত যুক্ত বা অংগীভূত কোন সংগঠনের সদস্য নহেন”-অর্থাত্ সংবিধানের নির্দেশনা ছিলো বর্তমান কালের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলের সাথে অসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে কিন্তু অতীত কালের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। অথচ আজকের প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সেদিন বর্তমান কালের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার না করে অতীত কালের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা পদে মেনে নেননি। কারণ কে এম হাসান দূর অতীতে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। কেউ কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ১/১১ কে সমার্থক ও একীভূত করে ব্যাখ্যা করেন। বরং সাংবিধানিকভাবে কে এম হাসানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে না দিয়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে জরুরী অবস্থা-ঘোষণা বা ১/১১ সৃষ্টি করা হয়েছিলো। এ নির্মম সত্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। নির্বাচনে কারচুপি হয় তবুও নির্বাচনের পদ্ধতি বাতিল করা হয় না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়কের নামে ১/১১ এসেছিলো এ জন্য তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে কথা বলা কতটুকু ন্যায় সংগত?
এখন দলীয় এবং সরকার প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী, দলীয় মন্ত্রিসভা রেখেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী আনা হয়েছে। অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মৌলিক প্রশ্নটি বাদ রেখেই আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বহুমাত্রিক সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি হবে। দশম সংসদ নির্বাচনের পর সাংবিধানিক জটিলতায় নবম সংসদের ৩৫০ এবং দশম সংসদের ৩০০ সংসদ সদস্য একই সময়ে অর্থাত্ ৩৫০+৩০০=৬৫০ জন সংসদ সদস্য কার্যভার প্রাপ্ত হবেন। যা বিদ্যমান সংবিধানের বিধি-বিধানের সাথে এবং গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় চেতনার সাথে চরম সাংঘর্ষিক।
আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হবে
সংসদ ভাঙ্গিয়া গেলে পদত্যাগ-মৃত্যু বা অন্য কোন কারণে.......
কিন্তু সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)ক মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। বিদ্যমান নবম সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৫ জানুয়ারী, ১৪। সংবিধান মোতাবেক দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে ২৫ অক্টোবর থেকে ২৫ জানুয়ারীর মধ্যে। জাতীয় সংসদের আসন শূন্য না করেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সংবিধান নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া একজন সংসদ সদস্য তার পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন আরেকজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তাতে নির্বাচনী মাঠ সমতল করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সাংবিধানিক কারণেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার’ই নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। আর তখনও সংবিধানের ৫৫(২) মোতাবেক প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে। সুতরাং বর্তমান সরকার দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার যাবতীয় সহযোগিতা সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করবেন। ধরে নিলাম দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সকল পক্ষের ঐকমত্য স্থাপিত হয়েছে। সুতরাং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
এই প্রেক্ষিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সিডিউল যদি নিম্নরূপ হয়ঃ ১০ নভেম্বর :মনোনয়নপত্র দাখিল, ১১ নভেম্বর : মনোনয়নপত্র বাছাই, ১২ নভেম্বর :মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ, ১৪ নভেম্বর :প্রতীক বরাদ্দ, ০৪ ডিসেম্বর :দশম সংসদের সাধারণ নির্বাচন।
প্রতীক বরাদ্দের ২০ দিন পর অর্থাত্ ০৪ ডিসেম্বর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনী ফলাফল চূড়ান্ত ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশ হতে পারে ০৮ ডিসেম্বর। গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে অর্থাত্ ১১ ডিসেম্বরের মাঝে দশম সংসদের সংসদ সদস্যদের শপথ নিতে হবে। সংবিধানের ১৪৮(২) মোতাবেক নির্বাচন ফলাফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ বাধ্যতামূলক করেছে। অথচ সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে তবে শর্ত থাকে যে......সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ. উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না। অন্যদিকে সংবিধানের নির্দেশনা মোতাবেক ১১ ডিসেম্বর দশম সংসদের সংসদ সদস্যগণ শপথ অনুষ্ঠান শেষে কার্যভার গ্রহণ করবেন। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সাথে সাথেই কার্যভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়। যা সংবিধানের ১৪৮(৩) নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ১৪৮(৩) এ বলা হয়েছে এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক সেইক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে। তাহলে নবম সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্য আর ১০ম সংসদের ৩০০ জন সংসদ সদস্য অর্থাত্ ৬৫০ জন সংসদ সদস্য ১১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারী পর্যন্ত কার্যভার প্রাপ্ত হইবে। যা সাংবিধানিক বিধি-বিধান এর সাথে চরম সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে যেহেতু দশম সংসদের ফলাফল ও গেজেট ০৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত হবে সেহেতু ০৭ জানুয়ারীর মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ আহ্বান করতেই হবে যা সংবিধানের ৭২(২) বাধ্যতামূলক করেছে। যাতে বলা হয়েছে ......যে কোন সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হইবে। সুতরাং নবম সংসদের মেয়াদ অক্ষত-অব্যাহত থাকা অবস্থায় দশম সংসদের অধিবেশন বসতেই হবে। সুতরাং রাষ্ট্রপতি নবম সংসদ না ভেঙ্গে এবং নবম সংসদের মেয়াদ অবসান ব্যতিরেকে কি করে দশম সংসদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। একই সংবিধানে সংসদ সদস্যদের যে সকল অধিকারকে বাধ্যতামূলকভাবে সুরক্ষা দিয়েছে সেই সংবিধানে আবার তা লংঘন করার নির্দেশনা দিয়েছে।
সুতরাং সাংবিধানিক জটিলতা ও চরম সাংঘর্ষিক অবস্থার অবসানকল্পে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী ১২৩(৩) এর (ক) এবং (খ) বাতিল করে ১২৩(৩) ‘মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে’-এই বিধান প্রতিস্থাপন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী এনে নির্বাচনকালীন সংকটের সমাধান করতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
লেখক :গীতিকার
[email protected]
