প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখন প্রতিদিন সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে তারা কোন আলোচনার প্রস্তাব দেবে না। ইতিমধ্যে তাদের দেয়া একাধিক সদস্যের মুলতবি প্রস্তাব তুলে নেয়া হয়েছে। নতুন করে এ ইস্যুতে তারা আর কোন আলোচনার প্রস্তাব না দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে একই ইস্যুতে সরকারি দলও আর বিরোধী দলের সঙ্গে কোন ধরনের আলোচনায় আগ্রহী নয় বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে বিরোধী দলের সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের উদ্যোগে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তুতি নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের অনিহার কারণেই তা ভেস্তে গেছে। ওই অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিরোধী দলের প্রতিনিধি গেলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের প্রতিনিধি যাননি। ফলে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের অবসান হচ্ছে না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পদ্ধতির ব্যাপারে তাদের অবস্থানের এখনো তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ফলে ক্রমশ এক অনিশ্চিত অবস্থার দিকে যাচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যত্। সংবিধান অনুসারে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে।
সরকারি দল আওয়ামী লীগ এখন পরিষ্কারভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সরকারি দল এখন আর নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায়ও আগ্রহী নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দেয়া বক্তৃতায় বিরোধী দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওই ধরনের সরকার এলে আর নির্বাচন হবে না। ফলে সরকার নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কিছুদিন আগেও যে আলোচনার সুর তুলেছিল সে অবস্থানে এখন আর তারা নেই।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ইত্তেফাককে বলেন, বিরোধী দল নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব দিয়ে আবার কেন তুলে নিয়েছে তা সকলের কাছেই অস্পষ্ট। বর্তমান সরকারের অধীনে যে কি পরিমাণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ তো সম্প্রতি শেষ হওয়া চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন। তাই এখন আর বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ লোকদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করতে। যার অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ওই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত কাউকে মানতে রাজি নন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য এ ব্যাপারে বলেন, নির্বাচিতদের মধ্য থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হলে বর্তমান সংসদে সংখ্যানুপাতে আওয়ামী লীগ দশ জনের মধ্যে আটজন পাবে। সেক্ষেত্রে ওই সরকার প্রধান যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও না হন, তবু আওয়ামী লীগের একজন যে হবেন সেটা নিশ্চিত। সে কারণেই বিএনপি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে থাকবে না। তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জায়গা থেকে কিছুটা সরে এলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কোন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চাইবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কোন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। নির্বাচনকালীন ওই সরকারের নাম অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক যাই হোক না কেন। তিনি বলেন, নির্দলীয় সরকার প্রধানের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সংলাপের উপর গুরুত্বঃ মুখে সংলাপের কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও আনুষ্ঠানিক কোন প্রস্তাব এখনো বিরোধী দলের কাছে পাঠানো হয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল নিয়ে আলোচনা হলে সেখানে তারা যেতে রাজি আছেন। অন্যদিকে সরকারি দল শর্ত দিয়ে আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান ইত্তেফাককে বলেন, আলোচনায় উভয়পক্ষকে বসতে হবে খোলা মন নিয়ে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কে পড়ে দেশ ইতিমধ্যে এক চরম সংকটের দিকে যাচ্ছে। সে কারণে এ সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে দুই দলকে বসে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। আলোচনার শিরোনাম হতে পারে, নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ ব্যাপারে বলেন, দুই দলের সংলাপে বসে শুধু নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নয়, নির্বাচন পরবর্তী বিষয়েও সমঝোতা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ, সংকট চলছে তা থেকে বের হওয়ার সুযোগ আসতে পারে সংলাপের মাধ্যমেই।
