কোনো না কোনোভাবে আমরা প্রতিনিয়তই জীবনের গভীরতর অভিজ্ঞতার সন্ধান করি। সে সন্ধান যারই হোক না কেন—ঈশ্বর, মদ, নেশার ওষুধ কিংবা ধ্যান। অথবা কিছুটা স্বস্তি বা পুলক, নয়তো স্রেফ তৃপ্তি বা পরিপূর্ণতার স্বাদ পেতেও আপনি শুধু জীবনের আরও বড় একটি অংশকে খুঁজেই চলেছেন।
ইচ্ছেটা বরাবরই একই রকম হয়। যেভাবেই হোক গভীরতর একটা অভিজ্ঞতা চাই, জীবন থেকে যাতে একটু বেশি কিছু আদায় করা যায়। মনে হয়, এখনও যা পাওয়া হয়নি তার একটা চাবিকাঠি পেতেই হবে। ইচ্ছেটা কী, সেটা মূখ্য প্রশ্ন নয়। কেননা সেটা তো বরাবরই একই রকম আছে। প্রশ্ন হল, তা দিয়ে কাজ হয় কি না। এ পর্যন্ত জীবনে আপনারা যা যা করেছেন, সবই তো আনন্দের খোঁজে: কাজকর্মের উন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, টাকা কামানো কিংবা সংসার পাতা। কিন্তু তা দিয়ে শিশুকাল থেকে এ পর্যন্ত আপনার জীবনে আনন্দ কি বেড়েছে, না কি কমেছে? যেহেতু এখন আপনি বড় হয়েছেন, আপনার এখন নিজের জীবন, নিজের পরিবার, নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সবই আপনার আছে। কিন্তু আপনার আনন্দ কি একইভাবে বেড়ে উঠেছে? গত চব্বিশ ঘণ্টায় কটি আনন্দের মুহূর্ত আপনি পেয়েছেন? অথচ যখন এই পৃথিবীতে আসেন, কোনও মূলধনই তো প্রয়োজন হয়নি। তাই জীবনে যাই ঘটুক না কেন, কোনও না কোনওভাবে সেটা তো আপনার লাভেরই অংশ। মানুষ তবুও নানা ধরনের দুর্দশা ভোগ করে, তার কারণ জীবনবোধের বদলে তার আছে শুধু অহংবোধ।
আপনি যদি দুঃখে থাকেন সেটা এ জন্যই যে জীবনটা যেমন হওয়া উচিত বলে আপনি ভেবেছিলেন, তেমনটা হচ্ছে না বা হয়নি। কিন্তু যেমনটা হওয়া উচিত বলে ভাবেন, সব কিছু যদি ঠিক তেমনই হত, তবে তো গোটা জীবনটাই আপনার ওই সীমাবদ্ধ চিন্তার পথ ধরেই চলতে থাকত। বরং এটাই কি চমত্কার নয় যে এমন কত কী ঘটছে, যা আপনি কখনও কল্পনাও করতে পারেননি? হয়তো আপনি যা উপভোগ করেছেন, আপনার মা-বাবা তাই নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকতেন। একই ভাবে আপনি আজ যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, আপনার সন্তানরা হয়তো ঠিক সেটাকেই উপভোগ করছে।
আপনার যাবতীয় অভিজ্ঞতার ধরন ও মূলটুকু রয়েছে আপনার ভিতরেই। ব্যথা ও সুখ, আনন্দ ও দুঃখ, যন্ত্রণা ও উল্লাসের সবটুকু আপনারই ভিতরে ঘটে চলেছে। আপনার অভিজ্ঞতার একমাত্র আসনটিই পাতা আছে আপনার অন্তরে। তা হলে বাইরে থেকে কেন আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করবেন? বড়জোর বাইরের পৃথিবী আপনার আনন্দের উদ্দীপনাটুকু জোগাতে পারে। তবু যদি আনন্দ পেতে বাহ্যিক দুনিয়ার উপর নির্ভর করেন, তবে বুঝতে হবে ঠিক যেমনটা আপনি চান, বাইরের জগত্ কখনই হুবহু তেমনটা হবে না। আর যাঁরা ভাবেন, আদর্শ পরিস্থিতি বলেও তো কিছু হয়, তাঁরা আসলে বাস্তবের সঙ্গে কোনও সমপর্কই রাখেন না। যেমনটা আপনি চান, কোনও ব্যক্তি বা কোনও পরিস্থিতিই কখনও ঠিক তার একশো ভাগই তেমন হতে পারে না। কিন্তু আপনি নিজে যা হতে চান, আপনার তো অন্তত তেমন হওয়া উচিত। তখন আর আপনার সুখের পিছনে ছুটে বেড়ানোর কোনও দরকার পড়বে না। সুতরাং প্রশ্নটা ওই ইচ্ছে বা তার ধরন নিয়ে নয়, বরং তাই করা যা কার্যকরী হবে যদি আপনি সেরকমই হয়ে উঠতে পারেন যেরকম আপনি নিজে হতে চান। তখন আপনি স্বাভাবিকভাবে আনন্দকেই বেছে নেবেন।
‘ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলতে যা বোঝানো হয় তার অর্থ হল, জীবনে আনন্দ অর্জন করার মতো কোনো বিষয় নয়, বরং আনন্দ আমাদের জীবনেরই মূল ভিত। আনন্দ কোনও লক্ষ্য নয়, বরং আনন্দ থেকেই আমাদের জীবনের সূত্রপাত। আনন্দ থাকলেই বাদবাকি সমস্ত কিছু ঘটতে পারে। নয়তো সারাক্ষণই আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে, কখন দুঃখ আঘাত হানে সেই ভয় নিয়ে। জীবনে কত বড় সাফল্য আপনি অর্জন করতে পারবেন, তা নির্ভর করে আপনার ক্ষমতা, পরিস্থিতি আর বর্তমান সময়ের উপর। তাই আপনি যাই করুন না কেন, আমার ইচ্ছে যে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা যেন সুন্দর ও মধুর হয়।
nসৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন
