বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি বলেছেন, রাজনৈতিক হয়রানি দক্ষিণ এশিয়ায় অভিনব কোনো ঘটনা নয়। বরং উত্তরোত্তর জ্যামিতিক হারে রাজনৈতিক নিপীড়নের মাত্রা বেড়েছে। আর আমিও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়ে আজ এই ট্রাইব্যুনালে এসে দাঁড়িয়েছি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের উপস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
সাক্ষ্য প্রদানকালে তিনি ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা, বর্তমানে রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক, ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রশাসনের আচরণসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এছাড়া নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে গতকালও কয়েক দফা রাষ্ট্রপক্ষের বাধার মুখে পড়েন এই সংসদ সদস্য। এ সময় স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় জবাব দেন তিনি। জবানবন্দি শেষে মামলার কার্যক্রম আগামী রবিবার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
জবানবন্দিতে ৩৩ বছরের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে ট্রাইব্যুনালে এসে দাঁড়িয়েছি। উপমহাদেশে রাজনৈতিক হয়রানি নতুন বিষয় নয়। কিন্তু মাত্রাটা বেড়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে রাজনীতিবিদদের কারারুদ্ধ করা হতো তাদের বাড়ি, ভিআইপি গেস্ট হাউস অথবা কখনও কখনও কারাগারের কোয়ার্টারে। রাজবন্দিদের শারীরিক নির্যাতন বা তাদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণের কোন নজির তখন ছিল না। রাজবন্দিদের তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো। তাদের ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু এবং তার পিতা পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুসহ অনেককে দীর্ঘদিন আটক রাখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে ব্রিটিশ রাজের ব্যবহার ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ। রাজবন্দিদের প্রতি এ ধরনের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ এমনকি ১৯৪৭ সালের পরেও বহাল ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনীতে এ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান আমলের দুঃসহ ২৩ বছরেও আমি এমন একটি ঘটনা মনে করতে পারছি না যেখানে কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর কোন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আমি শুনিনি।
২০০৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হওয়ার পর পোশাকধারী ব্যক্তিদের দ্বারা আমি প্রথম দুর্ব্যবহারের শিকার হই। সেসময় একজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা চোখ বেঁধে ধানমন্ডির বাসা থেকে ৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং নয় ফুট প্রস্থের একটি সেলে নিয়ে রাখে। আমার পাশের সেলেই আটক ছিলেন আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং আহম মোস্তফা কামাল। পরের ৪৮ ঘন্টা আমাদের টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় আমাদের সামরিক আতিথেয়তা দেয়া হয়। সেটা ছিল ২০ মাসের মানসিক আঘাতের শুরু। রাজনীতিবিদদের শারীরিক নির্যাতনের এ প্রক্রিয়ার আরো শিকার ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদেরসহ অনেকে। নির্যাতনের মাধ্যমে অনেকের কাছ থেকে তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বিবৃতি আদায় করা হয়েছিল। তখন কিছু গণমাধ্যম তা ফলাও করে প্রচার করে ছিল।
তিনি বলেন, প্রত্যেক পেশার লোকদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমিতি-সংগঠন রয়েছে। আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিত্সক, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও সমিতি রয়েছে। কিন্তু অসহায় রাজনীতিবিদদের নিজের স্বার্থ রক্ষায় কোন সমিতি নেই। বরং রাজনীতিবিদরা নিজ শ্রেণীর মানুষদের গ্রাস করতে ভূমিকা রাখেন। মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান হিসেবে জন্মের পর থেকেই রাজনীতির সঙ্গে আমার এক ধরনের সংযোগ ছিল। ভিন্নমতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ’৭০-এর দশক পর্যন্ত ছিল। আমার সাথে অন্য দলের রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। সংসদ ভবনের আশেপাশে পুলিশি পাহারা বসানো হয়। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও শপথ নিতে পারছিলেন না। তখন আগের দিন রাতে আমি তাকে নিয়ে সংসদ ভবনের ৭ তলায় একটি রুমে রাখি। পরদিন আমি নিজে তাকে স্পিকারের কাছে নিয়ে শপথ করাই। এ নিয়ে তখন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই সংস্কৃতি এখনকার রাজনীতিতে দেখা যায় না। এসময় তিনি তার বাবা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে জবানবন্দি দেয়ার রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুর বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীকে রাষ্ট্রদ্র্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই মামলায় ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে মাওলানা মোহাম্মদ আলী ২ মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। অথচ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র তিনদিন জবানবন্দি দেয়ার পরই আমাকে টাইম ম্যানেজমেন্টের কথা শুনানো হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নয়। তার জবানবন্দি থেকে আমরা কি পেলাম? এসময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, বিশ্বাস করুন আমাকে ফাঁসি দেয়ার প্রক্রিয়া আমি বিলম্বিত করবো না। একপর্যায়ে তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে বলেন, গত দেড় বছর ধরে রাষ্ট্রপক্ষ ৪১ সাক্ষী এনেছেন আমি কি প্রশ্ন তুলেছি? বাংলাদেশের সবাই জানে আমার মুখে যা আসে তাই আমি সামনাসামনি বলে ফেলি। আমার দোষ একটাই আমি পুরোটাই পলিটিশিয়ান।
