পুলিশের ভাষায় পারমিতা ( ছদ্মনাম) ‘ইয়াবা কন্যা’। রাজধানীর একটি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। সংসারে বাবা নেই, আছে মা ও ছোট বোন। বাবা এক সময় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। কয়েক মাস আগে তিনি মারা যান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার পারমিতাকে ১৮ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করে। একইসঙ্গে ধরা পড়ে তার আরো পাঁচ সহযোগী। এ ঘটনায় নগরীর মতিঝিল থানায় মামলা হয়েছে।
গতকাল বিকালে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে পারমিতার কথা হয়। তিনি অকপটে তার অপরাধ জীবনে প্রবেশসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়াবা ব্যবসায় সঙ্গে জড়িত গত তিন বছর ধরে। বছর খানে আগে নগরীর শ্যামলী এলাকা থেকে ইয়াবাসহ র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এরপর কারাবাস। সাড়ে নয় মাস কারাবাস শেষে মুক্তি পান বছর খানেক আগে। কিন্তু কারাবাসে গিয়ে নিজেকে সংশোধন করতে পারেননি। সেখানে যাদের সঙ্গে বসবাস করেছেন তারা খুনী, না হয় নানা অপরাধে যুক্ত ছিল। ফলে তাদের কাছ থেকেই ইয়াবা ব্যবসার ব্যাপারে আরো উত্সাহিত হয়েছেন।
কথা বলার সময় পারমিতা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘আলোর জীবন থেকে অন্ধগলির বাসিন্দা হয়েছি, শত চেষ্টা করেও ফিরতে পারেননি।’ কারাগার সম্পর্কে তিনি বলেন, কারাগারকে সংশোধনাগার বলা হলেও এখানে সংশোধিত হওয়ার মত কর্তৃপক্ষের কোন ধরনের তত্পরতা নেই। বরং কারাগারে কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারী মাদক ব্যবসা করেন।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান বলেন, ১৫ দিন আগে ইয়াবা ব্যবসায়ী লিপিকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে সে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। লিপির বাড়ি কুমিল্লায়। সে ইয়াবা ব্যবসার জন্য টাকা দাদন দিত। আর এই দাদনের জন্য একজনকে সে খুন করে। এছাড়াও নিজের ভাগ্নিকে পাচার করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়। এর আগেও দফায় দফায় জেল খেটেছে লিপি। এই লিপির সঙ্গে জেলখানায় পারমিতার পরিচয় হয়। আর একই সময় পারমিতা ও লিপি জামিনে ছাড়া পান। পারমিতা জেল থেকে ছাড়া পাবার পর লিপির সহায়তায় আবারো ইয়াবা ব্যবসা শুরু করে। লিপির দেয়া তথ্যমতেই পারমিতাসহ ৬ জনকে গতকাল বৃহস্পতিবার কমলাপুর ও বনশ্রী এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পারমিতা বলেন, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের একটি স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাশ করেন। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে পাশ করেন এইচএসসি। এরপর ঢাকায় এসে একটি কলেজে অনার্সে ভর্তি হন (হিসাব বিজ্ঞান)। তখন বাসা ছিল বিমান বন্দর এলাকায়। ২০১০ সালে হঠাত্ করে পরিচয় হয় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুরের সঙ্গে। সে রাজধানীর শুক্রাবাদে ব্র্যাক ব্যাংক ডাকাতি মামলার অন্যতম আসামি। ব্র্যাকের লুষ্ঠিত স্বর্ণ বিক্রি করে শুক্কুর ভাগের অংশ পেয়েছিল ২ কোটি টাকা। সে-ই তাকে ইয়াবা ব্যবসায় নামিয়েছে। শুধু ব্যবসায়ই নয়, শুক্কুরের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু আশ্বাস দিলেও তাকে বিয়ে করেনি শুক্কুর। বরং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাকে স্ত্রীর মত ব্যবহার করেছে।
পারমিতা বলেন, ২০১১ সালে র্যাব তাকে গ্রেফতার করে। জেল থেকে ছাড়াবার ব্যাপারে শুক্কুর সহায়তা করে। তবে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর বহুবার চেষ্টা করেও অন্ধকার পথ থেকে ফিরতে পারেননি।
আপনি কী ইয়াবা খেয়েছেন - এমন প্রশ্নের জবাবে পারমিতা বলেন, তিনি গত তিন বছরে দেড় লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করছেন। তবে তিনি কখনও ইয়াবা খাননি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইয়াবা আসে মায়ানমার থেকে। চট্টগ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করতেন। আর প্রতি পিস ইয়াবা কিনতেন ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। আর ঢাকায় বিক্রি করতেন ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। ইয়াবার চালান কখনো ট্রেনে আবার কখনও বাসে আসে।
কথা বলার এক পর্যায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পারমিতা। তিনি বলেন, সংসারে ছোট বোন ও মা আছেন। তাদের দেখাশুনার কেউ নেই। যদি ছাড়া পাই তাহলে চেষ্টা করবো নিজেকে সংশোধন করতে। আগামী মাসের তিন তারিখ তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। জেলখানা যাওয়ার পর জেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় পরীক্ষা দেবার চেষ্টা করবে সে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মাহবুব হোসেন বলেন, পারমিতার সঙ্গে গ্রেফতার করা হয় তাহের, খালেদ, জানেআলম ও কুলসুমকে। তাদের অপর সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। গ্রেফতারকৃতদের আজ শুক্রবার আদালতে হাজির করা হবে।
