বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমলেও রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। প্রায় ১০ বছরে সারের ব্যবহার ৪ গুণেরও বেশি বেড়েছে। আর প্রতিবছর কৃষি জমির পরিমাণ এক শতাংশ হারে কমছে। বর্তমানে দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৯০ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। মূলত জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাবার কারণে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়লেও কৃষকদের অসচেতনতাও এর জন্য দায়ী বলে কৃষিবিদরা মনে করছেন। তারা জানান, চাষের জমিতে যে পরিমাণ সার প্রয়োজন হয় কৃষকরা ব্যবহার করে তার চেয়ে বেশি। যে জমিতে ব্যবহারের প্রয়োজন নেই সে জমিতেও অনেক সময় কৃষকরা সার ব্যবহার করে। তবে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমলেও দেশে ফসলের উত্পাদনও বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, সারের ব্যবহার বেড়ে যাবার কারণ অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—ফসলের বিভিন্ন ভ্যারাইটি। এসব ভ্যারাইটিতে ভালো ফলন পেতে হলে সারের পরিমাণ বাড়াতে হয়। এছাড়া বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য কমেছে। তিনি বলেন, ফসলী মাটিতে তিন মাত্রার জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে এর পরিমাণ গড়ে এক শতাংশ। এজন্য জৈব পদার্থ বাড়াতে সারের মাত্রাও বাড়াতে হচ্ছে। উর্বরতা বাড়াতে তার অধিদপ্তর নানা কর্মসূচি নিচ্ছে বলে তিনি জানান।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে দেশে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৩৭ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪০ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন। আর চলতি অর্থবছরে রাসায়নিক সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাত্ প্রায় ১০ বছরে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে ১১ লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া ২০০৪-০৫ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৩৯ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের ব্যবহার বেড়ে হয় ২২ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন। আর বর্তমান অর্থবছরে এই সারটি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। অপরদিকে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি সার ব্যবহার হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান অর্থবছরে এ সারটি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ মেট্রিক টন। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ডাই এমোনিয়া ফসফেট বা ডিএপি সার ব্যবহার হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান অর্থবছরে এ সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ মেট্রিক টন। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে মিউরেট অব পটাশ বা এমওপি সার ব্যবহার হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে এ সার ব্যবহার হবে ৮ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে জিপসাম সার ব্যবহার করা হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান অর্থবছরে এই সার ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা একই আছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাবুিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জমির উর্বরতা ক্রমেই কমছে। এক সময় বন্যার সাথে সাথে জমিতে পলি পড়ে উর্বর শক্তি বাড়তো। এখন বন্যার সাথে পলি আসে না বলে উর্বর শক্তি কমে সারের ব্যবহার বাড়ছে।
এদিকে সব সার কৃষিতে ব্যবহার হয় না। রাসায়নিক সারের এখন বহুবিধ ব্যবহার হচ্ছে। মাছ চাষ, গবাদিপশু মোটাতাজাকরণসহ নানা কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি ইউরিয়া সার দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাবার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে গেলেও সারের ব্যবহার যেমন বাড়ছে সাথে সাথে ফসলের উত্পাদনও বাড়ছে। মূলত ফসলের ক্ষেত্রে নানা বিদেশি জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে উত্পাদন বাড়ছে। বিদেশি এসব ভ্যারাইটি ব্যবহারের কারণে সারের ব্যবহারও বেড়ে যাচ্ছে বলে কৃষিবিদরা মনে করছেন।
রাসায়নিক সারের ব্যবহার
অর্থবছর: ২০০৪-০৫—২০১২-১৩
ইউরিয়া: ৫২৩৩৯০—২৫০০০০০
টিএসপি: ৪২০০২০—৭০০০০০
ডিএপি: ১৪০৭২০—৬০০০০০
এমওপি: ২৬০৩৮০—৮৭০০০০
মোট: ১৩৪৪৫১০—৪৬৭০০০০
### হিসাব মেট্রিক টনে
