‘ট্রাক, মালামাল সব নিয়ে যাও। তোমরা আমাকে মেরো না। ঘরে আমার নতুন বৌ। বিশ্বাস না করলে দেখ আমার হাতে এখনও মেহেদীর দাগ লেগে আছে। আল্লাহর দোহাই! আমি কাউকে কিছু বলবো না।’ মৃত্যুর আগে এভাবেই ডাকাতদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন ট্রাকচালক আব্দুল মজিদ (৩০)। একই সঙ্গে ডাকাতরা হত্যা করে ট্রাকের হেলপার সাইফুলকে (২২)। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা আরিচা মহাসড়কে। গতকাল শনিবার সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের বালিঘাটা চরখাতরা সংলগ্ন নদী থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। আর ঐদিন ভোররাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানীর আগারগাঁও থেকে গ্রেফতার করেছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৯ ডাকাতকে। উদ্ধার করা হয়েছে লোহার রডভর্তি ছিনতাইকৃত ট্রাক (কুষ্টিয়া ট-১২৩১)। গ্রেফতারকৃত ডাকাতরা গোয়েন্দাদের কাছে চালক ও হেলপারকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। এ মহাসড়কে চালক ও হেলপারকে খুনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতি ও ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ড্রাইভারস ইউনিয়ন। নেতৃবৃন্দ মহাসড়কে অব্যাহত ডাকাতি ছিনতাইয়ের জন্য হাইওয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তাকে দায়ি করেছেন। ট্রাক মালিক কুষ্টিয়ার তটতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাবলু ইত্তেফাককে বলেন, ট্রাকচালক মজিদ ও হেলপার সাইদুল গত বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে ২০ টন লোহার রড নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার উদ্দেশে রওয়ানা হয়। চট্টগ্রাম থেকে ট্রাক ছাড়ার পর চালকের সঙ্গে তার ম্যানেজার রানার কয়েক দফা কথা হয়েছে। কিন্তু রাত ১০টার পর থেকে চালক মজিদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় ম্যানেজার চট্টগ্রামেও যোগাযোগ করে। পর দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন লোহার রডভর্তি ট্রাকটি ছিনতাই হয়েছে। ট্রাকটি উদ্ধার হয়েছে। আর ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ খবর পাওয়ার পর তিনি ম্যানেজারকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। তিনি কথা বলেন, ডিবি এডিসি মশিউর রহমানের সঙ্গে। তবে তখন পর্যন্ত চালক ও হেলপারের অবস্থান জানা যায়নি। পরে গ্রেফতারকৃত ডাকাতদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করে। ডাকাতদের স্বীকারোক্তিমতে গতকাল চালক ও হেলপারের লাশ উদ্ধার করা হয়।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে ডাকাতরা জানিয়েছে, তার দলে ছিল ১৭ থেকে ১৮ জন। তিনটি খালি ট্রাক নিয়ে তারা লোহার রডভর্তি ট্রাক ছিনতাই করে আরিচা সড়কে। পরে চালক মজিদ ও হেলপার সাইদুলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। আরিচা সড়কের কর্ণপাড়া ব্রিজ থেকে দু’জনের লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে। এরপর ছিনতাইকৃত ট্রাক নিয়ে তারা ঢাকায় আসে। ভোর রাতের দিকে তাদের একটি গ্রুপ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। হত্যার বর্ণনা দিয়ে ডাকাতরা জানিয়েছে, ট্রাক ছিনতাই করার পরপরই চালক ও হেলপারের হাত-পা বেঁধে ফেলে। হাত-পা বাঁধার সময় চালক প্রাণভিক্ষা চায়। চালক মজিদ নিজের দুই হাত দেখিয়ে বলছিলঃ ‘আমি কিছুদিন আগে বিয়ে করেছি। আমাকে মেরো না। তোমাদের কোন ক্ষতি আমি করবো না।’ একইভাবে অনুরোধ করেছিল হেলপার সাইদুল। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকায় তাদেরকে অন্য একটি ট্রাকে তুলে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর ট্রাকটি ব্রিজের রেলিং ঘেঁষে দাঁড় করানো হয়। পরে ট্রাকের পেছনের ডালা খুলে চারজনে মিলে তাদের হাত-পা ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় নদীতে। ট্রাক মালিক বাবলু বলেন, চালক মজিদের বাড়ি কুষ্টিয়ার সদর থানার কবুরহাট। অপরদিকে সাইদুলের বাড়িও একই এলাকায়।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, সম্প্রতি সময় মহাসড়কে ডাকাতি ছিনতাইয়ের ঘটনা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান ড্রাইভারস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আল মন্টু। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক কাভার্ডভ্যানে ডাকাতির পাশাপাশি চালক, হেলপার খুনের ঘটনাও ঘটে। এসব নিয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে ইতিপূর্বে বহুবার প্রতিকার ও মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
