কল্পনা চাকমা! একটি উজ্জ্বল ও বেদনার নিরবধি নদীর মতন নাম। খুব অল্প বয়সেই যিনি প্রান্তিক ও আদবাসী নারীদের জীবন, সংগ্রাম অতঃপর মুক্তির কথা ভেবেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর! কিন্তু ১৯৯৬ সালে পার্বত্যচুক্তি সম্পাদন হবার আগেই অপহূত হন তিনি। দীর্ঘ সতের বছরেও মেলেনি তার সন্ধান। এমনই একটি স্পর্শকাতর ও মানবিক বিষয়কে কেন্দ্র করে দৃক গ্যালারি আয়োজন করেছিল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটো জার্নালিস্ট শহিদুল আলমের একক প্রদর্শনী ‘সার্চিং ফর কল্পনা চাকমা’....‘কল্পনা চাকমার খোঁজে’....একটি ফটো-ফরেনসিক স্টাডি। শিল্পিত মনের আবেগ, জিজ্ঞাসা....কল্পনা অতঃপর একটি চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে একজন শিল্পী কি করেন? একজন সাংবাদিক কিভাবে অধিগম্য করে তোলেন কোন একটি প্রতিবেদনের কাহিনীকে? একজন বিজ্ঞানী কিভাবে অনুসন্ধান করেন? এভাবেই শহিদুল আলম কল্পনা চাকমাকে নিয়ে একজন শিল্পী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ভেবেছেন, আলোকচিত্রী হিসেবে চেষ্টা করেছেন কল্পনা চাকমার ‘হারিয়ে যাওয়ার’ দৃশ্যকে স্পর্শনীয়ভাবে দৃশ্যমান করে তুলতে। কল্পনা চাকমাকে নিয়ে দুর্দান্ত গবেষণাটি করেছেন সায়দিয়া গুলরুখ। আলোকচিত্র তোলা হয়েছে কুইন্সল্যান্ড ব্রেইন ইন্সটিটিউটে জেইস স্টেরিওডিসকভারি ভি-৮ স্টেরিও মাইক্রোস্কোপ প্ল্যান এস ১.০–অবজেকটিভ এবং একটা জেইস এক্সিও ইমেজার জেড-১ আপরাইট মাইক্রোস্কোপ—প্ল্যান নিউফ্লুয়ার ৫–অবজেকটিভ, ৪০৫ এনএম ফ্লুরোসেন্স এক্সাইটেশন, ৪২০-৪৮-এন এম ফ্লুরোসেন্স এমিশন ব্যবহার করে।
গ্যালারি জুড়ে প্রদর্শনীর উপস্থাপনা ছিল ভিন্ন মাত্রার। কল্পনা চাকমার বাড়ি ও উঠোনের ছবি, কল্পনার জামা ১, উনার ভাই বলেছেন... ‘উনার (কল্পনার) অনেক বই ছিল। .... মাও সেতুং-এর ৩ খণ্ড বই ছিল....এই যে দেখেন এই বইটা রাশিয়ার নারীর অবস্থান।’ কল্পনার লাল ওড়নাটি উঠে এসেছে শহিদুল আলমের ফটোগ্রাফিক ফ্রেমে। যেমন কল্পনা চাকমার বাড়ির কাছে গাছের বাকলের ছবি তুলেছেন....শিরোনামে উঠে এসেছে রাইসা অং মার্মার কবিতা ‘প্রতিজ্ঞা করো হে বিপ্লব, তুমি আসবে জুম্ম জাতির হূদয়ে, আসবে তোমার স্বরূপে.... তোমায় দেখি কল্পনার অবগাহনে।’ ফিতা.... ছবিটি তুলেছেন শহিদুল আলম কল্পনার ঘরের বেড়ার খাঁজে বাঁধা ছিল রঙ্গিন ফিতা, লিখেছেন, ‘কল্পনা সাজতে পছন্দ করত কিনা তা আমাদের কোনদিন হয়ত জানা হবে না। জামা-২ ছবিটি ধূসর.... লেখা ছিল—‘হিল উইমেন্স ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে কল্পনা চাকমার জাতিসংঘ আয়োজিত ৪র্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বেইজিং যাওয়ার কথা ছিল। সেই উপলক্ষে বানানো সালোয়ার কামিজের ছবি এটি। ‘জুতা-১’ ছবিটি ভিন্ন মাত্রার। সেখানে শহিদুল আলম লিখেছেন কল্পনা চাকমা অপহূত হন পাবর্ত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার এক বছর আগে। পাহাড়ি নারীদের দৈনন্দিন জীবন, চলাফেরা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার সংকল্প নিয়েই কল্পনা চাকমা ও তাঁর সহযোদ্ধারা হিল উইমেন্স ফেডারেশন গঠন করেন। এমনও দিন গেছে কল্পনা চাকমা মাইলকে মাইল হেঁটেছেন! এই ছবিটি কল্পনার জুতার একটি অংশ। আবার পাতা শীর্ষক ছবিতে শহিদুল আলম লিখেছেন—‘কল্পনা চাকমা তাঁর গ্রামের নারীদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করেছিলেন। সমিতিটির নাম দিয়েছিলেন তাঁরা ‘এক মুঠো চাল’। বাঙালিদের ভয়ে অনেক সময় বাজারে যাওয়া পাহাড়িদের পক্ষে সম্ভব হতো না। এমন বিপদের দিনে যাতে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে তাই এই সমিতি থেকে তাঁরা শাক-সবজির গাছ লাগাতেন, প্রতিদিন রান্না করার সময় এক মুঠো চাল আলাদা মাটির হাঁড়িতে তুলে রাখতেন। কল্পনার পাড়ায় একটি গাছের পাতার ছবি এভাবেই মর্মস্পর্শীভাবে উঠে এসেছে শহিদুল আলমের লেন্সে। এভাবে ছবিগুলোর মাঝে কল্পনা চাকমার জীবনের বিভিন্ন আলো-অন্ধকার তুলে এনেছেন শহিদুল আলম। প্রদর্শনীতে ভিডিও প্রজেক্টরে বিভিন্ন মানুষের জবানবন্দি দেখানো হয়েছে। সেইসঙ্গে অপূর্ব আলোক প্রক্ষেপণে দেয়ালে ভেসে উঠছিল কল্পনা চাকমার পোর্ট্রেট। কল্পনা চাকমার লেখা ডায়েরি, কল্পনা চাকমার বাড়ির বিভিন্ন স্থানের ছবি একটি ফটো ফরেনসিক স্টাডির মাধ্যমে শহিদুল আলম অপূর্ব ও অভূতপূর্ব দিকনির্দেশনার স্বাক্ষর রাখলেন ফটো-জার্নালিজম, আলোকচিত্র শিল্প ও শিল্পকলার মাধ্যমে। দর্শককে তিনি একটি নতুন অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করালেন, মানবতা ও বিবেককে শানিত করলেন, কল্পনার মাঝেই সৃষ্টি করলেন শিল্পিত দায়বদ্ধতা।
