গণতন্ত্রের সুফল পাচ্ছে না মিসর!

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:৩৩
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির অধীনে একবছর পার করেছে মিসর। এ পর্যায়ে দেশটিকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে বেশি মোকাবেলা করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ। যা কিনা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের মতামতের ওপর একটি পিউ সার্ভে প্রকাশিত হয় গতমাসে। এত দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ লোক অন্য যে কোনো ধরনের সরকারের চেয়ে গণতন্ত্রকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। ৫১ শতাংশের রায়, অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি থাকলেও তারা গণতন্ত্রের অধীনেই থাকতে চান। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি এই বিশাল আনুগত্য পাল্টে যায় আরেকটি প্রশ্নের প্রেক্ষিতে। জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, তাহলে কি আপনি দৃঢ় অর্থনীতির চেয়ে দৃঢ় গণতন্ত্রকে বেশি পছন্দ করেন। এমন প্রশ্ন শোনার পর হ্যাঁ সূচক জবাব দেন শতকরা ৪৫ জন। পক্ষান্তরে ৫২ শতাংশ জবাব দেন— শক্তিশালী গণতন্ত্রের চেয়ে সুদৃঢ় অর্থনীতির অধীনে থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার দিশেহারা:২০১১ সালের শুরুতে বিপ্লবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আশায় বুক বেঁধেছিলো মিসরীয়রা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে গুড়ে বালি। প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুরসির অধীনে কঠিন একটি বছর কেটেছে এবং আসছে অর্থবছরের জন্য সুখবর বলতে তেমন কিছুই নেই, যা শুরু হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। প্রস্তাবিত বাজেট দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়, সেই পুরনো সমস্যাগুলো নিয়েই হাবুডুবু খাবে বর্তমান সরকার। নতুন প্রকল্পের জন্য তেমন বরাদ্দ থাকবে না। বাড়বে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় এবং বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে হবে দেশি-বিদেশি উত্স থেকে। সেই সঙ্গে গুনতে হবে প্রচুর সুদ। এ সবকিছুর পর ক্রমাবনতিশীল জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের পেছনে ব্যয়ের জন্য খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন সরকারি বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৭৩.৭ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড ( ৯.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯.৬ শতাংশ। আগের বছর এটি ছিলো ১০.৭ শতাংশ । তবে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আল জাজিরার সাংবাদিকরা। তাদের মতে, ঘাটতি কমানোর মতো সক্ষমতাই নেই বর্তমান সরকারের। এ বছর আরো ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণ নিতে হবে। এখন পর্যন্ত তাদের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৪৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের চেয়ে যা ৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি। সুদ দিতে দিতেই কাহিল হয়ে পড়ছে দেশ। সেজন্য বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ মিলে না। আরেক সমস্যা বেকারত্ব। মিসরের ৩৫ লাখ লোক বর্তমানে কর্মহীন। সরকারের লক্ষ্য বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের নিচে রাখার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার আসছে অর্থ বছরে ৮০ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি করবে। কিন্তু এ সংখ্যাটা বেকারত্বের হার কমাতে মোটেই অবদান রাখবে না। কারণ মিসরের চাকরির বাজারে প্রতিবছর প্রায় সমসংখ্যক নতুন চাকরিপ্রার্থী যুক্ত হয়। অধিকন্তু ২ কোটি ৭৩ লাখ সক্রিয় কর্মজীবীর মধ্যে ২ কোটি ১৩ লাখ অস্থায়ী শ্রমিক। এদের ৪৬.৫ শতাংশ কাজ করে কোনো চুক্তি ছাড়াই। ৬৭ শতাংশেরই স্বাস্থ্যবীমা নেই। অবাক করার মতো তথ্য হলো— মিসরের শতকরা ২৫ জন লোক এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। রাজধানী কায়রোর ফুটপাতে অনেকেই শুয়ে থাকে সাহায্য পাওয়ার আশায়। মোবারকের আমলে এতোটা খারাপ পরিস্থিতি ছিলো না। মুরসির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা:ক্ষমতাসীন ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির অর্থনৈতিক কমিটির সদস্য আব্দেল হামিদ স্বীকার করেন, বর্তমান সরকার দারুণ অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। তবে এসব নতুন কিছু নয়। মোবারকের সময়কার এবং ক্রান্তিকালের সমস্যাগুলোই বস্তুত আরো ঘনীভূত হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিম্ন হার, উচ্চ বাজেট ঘাটতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অধিক প্রত্যাশার কারণে বর্তমান সরকার এখন অনেকটাই দিশেহারা। ঘরে ঘরে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। কেউ কেউ বলছেন, সকল অর্থনৈতিক সমস্যার মূলে হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়া। ফের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে এ আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট মুরসি জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ মনযোগী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে একটি উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছে। গমের উত্পাদন বাড়িয়ে বিদেশি গমের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে কৃষকদের আগের সব কৃষিঋণ মওকুফ করে দেয়া হয়েছে। এতে কৃষকরা অবশ্য যারপরনাই খুশি। প্রেসিডেন্ট মুরসি বসে নেই, চষে বেড়াচ্ছেন গোটা বিশ্ব। অতিসম্প্রতি তিনি চীন, ব্রাজিল ও ইতালি সফর করেন। এর মূল উদ্দেশ্য— বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রিম আব্দ এলহালিম মনে করেন, মিসরের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ না বাড়লে এবং ইজিপশিয়ান পাউন্ডের ওপর অত্যধিক চাপ না কমলে সমস্যাগুলো সমস্যা হিসেবেই থেকে যাবে; গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করাটা আর হয়ে উঠবে না। এভাবে চলতে থাকলে অধিকাংশ লোক একসময় বলতে শুরু করবে মোবারকের যুগেই ভালো ছিলাম; বিফলে গেছে তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলন; কোনো প্রয়োজনই ছিলো না আরব বসন্তের। তখন হয়তো আবার আন্দোলন শুরু হবে।