রাজধানীর রাজপথ বন্ধ করে মিছিল সমাবেশের প্রবণতা নতুন নয়। দিনের পর দিন রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি অনেক অরাজনৈতিক সংগঠনও এই সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আর রাজপথে বের হওয়া সাধারণ মানুষ এসব কারণে হয়রানির মধ্যে পড়বেন, ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকবেন— এই সংস্কৃতিকেও তারা মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এভাবে কতদিন! এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের কি কোন পথ নেই? রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে রাজনীতি করেন। কিন্তু কয়েকশ’ কর্মী-সমর্থক নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একটা মিছিল করেন আর দুর্ভোগে পড়েন রাজপথে বের হওয়া হাজার হাজার মানুষ। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হলেও রাজপথে নামেন, আবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনন্দ শোভাযাত্রাও বের করেন রাজপথে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আনন্দ-বেদনা সবকিছুর জন্যই দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
গতকাল রবিবার ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আনন্দঘন করতে বিকালে রাজধানীতে বের করা হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। তার আগে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ। সবই হয়েছে রাজপথে। বিকাল ৩টায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইনষ্টিটিউশনে শুরু হয় সমাবেশ। তার অনেক অগে থেকেই শাহবাগ থেকে মত্স্যভবন সড়কটি এবং আশপাশের কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ। কারণ আশপাশ এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা ওদিকেই যাচ্ছিলেন। তখন থেকেই যানজটের শুরু। সমাবেশ শেষে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালি বের করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। ব্যস্ততম শাহবাগ হয়ে র্যালি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। ততক্ষণে নিউমার্কেট থেকে আসাদগেটের সড়কটিও বন্ধ করে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা শাহবাগ থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত অনেকগুলো রাস্তা বন্ধ থাকে। পরিনতি যা হওয়ার তাই হয়েছে? দীর্ঘ যানজট আর দুর্ভোগে নাভি:শ্বাস উঠে সাধারণ মানুষের। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা রাজপথে গাড়িতে আটকে থেকে প্রচণ্ড বিরক্ত হন মানুষ। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে শিশু ছিল তাদের দুর্ভোগ ছিল সীমাহীন। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির অনেক যাত্রী বলছিলেন, রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকে জিম্মি দশা থেকে কি সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না? এভাবে কেন সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে তাদের রাজনীতি করতে হবে। বিকল্প কি কিছু তাদের নেই?
শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সব রাজনৈতিক দলের একই অবস্থা। গত ১৪ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। আর ওই সমাবেশের কারণে প্রেসক্লাব, শাহবাগ ও পুরনো ঢাকার অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়েন রাজপথে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। তারও আগে গত ৪ মে রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে সমাবেশ করে বিএনপি। ওইদিন কার্যত অচল ছিল বাণিজ্যিক এলাকাটি। অনেক কর্মকর্তা সেদিন তো অফিসেই যেতে পারেননি। আর যারা অফিসে পৌঁছেছেন তাদের দুর্ভোগ ছিল আরো সীমাহীন। কোন ধরনের যানবাহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে তাদের অফিসে পৌঁছতে হয়েছে। এমনিতেই তো হরতাল, ছুটি তারপর আবার রাজনৈতিক দলের সমাবেশের কারণে যদি প্রধান বানিজ্যিক এলাকা বন্ধ থাকে তাহলে অর্থনীতির অবস্থা কি হতে পারে? আর দুর্ভোগ বা যানজট তো আছেই।
মতিঝিলে বিএনপির সমাবেশের পরদিন ছিল হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশ। সেদিন তো মতিঝিলে কেয়ামত দেখে ফেলেছেন অনেকে। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের পাশাপাশি ছিল ভবনে আগুন দেয়া থেকে শুরু করে রাজপথের গাছও উপড়ে ফেলেন তারা। তাই বাণিজ্যিক এলাকায় রাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। এরও আগে শাহবাগের সবগুলো সড়ক বন্ধ করে দিনের পর দিন সমাবেশ করেছে গণজাগরণমঞ্চ।
সাধারণ মানুষ বলেন, ছুটির দিনেও তো সমাবেশ হতে পারে? কিন্তু অফিস চলাকালীন সময়ে কেন রাজধানীর প্রধান এলাকায় মিছিল সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে। তাই সাধারণ মানুষের দাবি, রাজপথে সব ধরনের মিছিল-সমাবেশ বন্ধ করা হোক। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমাবেশ করতে হলে আশপাশের কোন খোলা মাঠে করা উচিত্। আর কথা-বার্তা ছাড়াই হুট করে রাজপথে মিছিল করার বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষের অবস্থান।
