নারায়ণগঞ্জ :আলোর নিচে এক চিলতে অন্ধকার

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২১:২২
একটা সময় ছিল যখন পাঠ্য বইয়ে স্বাস্থ্যকর স্থানের তালিকায় নারায়ণগঞ্জের নাম ছিল অন্যতম। আজ সেই নারায়ণগঞ্জ এখন হতশ্রী শহরে পরিণত হয়েছে। যে নারায়ণগঞ্জের নাম শুধু বিলাতের মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো, যে শীতলক্ষ্যা নদীর শুপেয় পানি ব্রিটিশ বণিকরা বাণিজ্য শেষে বতলজাত করে নিজ দেশে নিয়ে যেত সেই শীতলক্ষ্যার পানি এখন এতটাই দূষিত যে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীর দিয়ে হাঁটার সময় মুখে রুমাল চেপে চলতে হয় পানির দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য। ঢাকা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হওয়ার আগে ও পরে ভারত বর্ষ থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীরা নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে আসা-যাওয়া করতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ব্রিটিশ বিরোধী বাঙালি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুসহ অনেকের স্মৃতি বিজড়িত নারায়ণগঞ্জ এখন একটি সাধারণ জেলা মাত্র । অথচ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কলকাতায় নেতাদের কাছে পাঠানো হতো। ব্রিটিশ আমলে এই বাংলাদেশে প্রথম যে রেল লাইনটি স্থাপিত হয় তা হল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ। একসময় পূর্ব বাংলার সকল ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই নারায়ণগঞ্জ। ব্রিটিশরা পাটসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ের জন্য নারায়ণগঞ্জে আসত। আর এ জন্য তাদের বিনোদনের স্বার্থে গড়ে তুলেছিল তত্কালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব। যা এখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাব নামে পরিচিত। সকল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জকে একসময় বলা হতো প্রাচ্যের ডান্ডি। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ তার ঐতিহ্য কিছুটা ধরে রাখলেও রাজনীতিকদের অবহেলা, এলাকার প্রতি খেয়াল না রাখা , এলাকার উন্নয়ন ধরে রাখার পরিবর্েত ক্ষমতাসীনদের বিভেদের কারণে দিন দিন প্রাচ্যের ড্যান্ডি এখন অনেকটাই শ্রীহীন। নীট গার্মেন্টস শিল্প ছাড়া বড় ধরনের বলার মতো বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী শিল্প প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জে নেই বললেই চলে। সুতা, রং, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন ব্যবসা দিন দিন অন্যত্র চলে যাচ্ছে। পাটশিল্পের জন্য যে নারায়ণগঞ্জ ছিল বিখ্যাত তা এখন খুলনায় চলে গেছে। কিছু কিছু বড় বড় ইমারত তৈরি ছাড়া নগরবাসীর অন্যকোন সুযোগ-সুবিধা নেই। একমাত্র তিনটি স্টেডিয়াম ছাড়া চিত্তবিনোদনের কোন ব্যবস্থা নেই। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় যেতে কত সময় লাগবে নির্ির্দষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না। শহরে নতুন কোন সড়ক নির্মাণ হয়নি । আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ । আইনের শসন বলতে যা বোঝায় তা এখানে অনেকটা অনুপস্থিত । দেশের অন্যজেলাগুলিতে সংবাদপত্র বের করতে জেলা মেজিস্ট্রিটের অনুমতি লাগলেও এখানে ডিএমএর অনুমতি ছাড়াই সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। এক কথায় যে যেভাবে পারছে ক্ষমতা প্রয়োগ করছে । রহস্যজনক কারণে প্রশাসন প্রায় সব বিষয়ই যেনো নির্বিকার। আর এ অবস্থা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বৃদ্ধি পেয়েছে। আশির দশকেও নারায়ণগঞ্জের রাজপথ ছিল ছিমছাম, কৃষ্ণচূড়া শোভিত, যানজট বিহীন। রাস্তার দু’পাশে পুরনো ভবনের সারি। শহরের কেন্দ্র থেকে একটু বাইরে গেলেই খোলা মাঠ, খাল, জলাশয়। জলাশয়ে পানি, মাছ, জলজ উদ্ভিদ। গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জের জনসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। পুরনো ভবন, খালি মাঠে অথবা জলাশয় ভরাট করে উঠেছে অসংখ্য সুদৃশ্য ভবন। শহরের জৌলুশ আগের চেয়ে অনেক গুণ বড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এই বাড়-বাড়ন্তটি হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে সমস্যার শেষ নেই নারায়ণগঞ্জ শহরের। সমস্যার পাহাড় রয়েছে শহরের বাইরেও। শহরের এ ক্রমবর্ধমান সমস্যা ভাবিয়ে তুলেছে সচেতন শহরবাসীকে। অনেকেই মনে করেন শহরের সমস্যাগুলি এত প্রকট হতো না যদি নারায়ণগঞ্জের তিন প্রশাসন- জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন প্রশাসনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকত। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এখন ভূমিদস্যুদের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভূমিদস্যুদের কারণে অনেকেই দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার ভিটেমাটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। অন্যথায় ভূমিদস্যুরা জোরর্পূবক ভুয়া দলিলপত্র করে জায়গা দখল করে নিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ মাদকের ট্রানজিট রোড হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে লাখ লাখ টাকার মাদক আসা-যাওয়া করছে। পুরো নারায়ণগঞ্জ মাদকে সয়লাভ হয়ে পড়েছে। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। স্কুল-কলেজের উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। একজন সমাজ বিজ্ঞানী জানান, বিনোদনের কোন ব্যবস্থা না থাকার কারণে ছেলে-মেয়েরা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সিটি কর্পোরেশন এ পর্যন্ত বিনোদনের কোন ব্যবস্থা করতে না পারলেও শহরে তাদের যেসমস্ত খালি যায়গা আছে সেখানেই গড়ে তুলছে ইমারত। নারায়ণগঞ্জে কোনকিছুই পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জকে এক সময়ে প্রাচ্যের ডান্ডি বলা হতো। কিন্তু সেই জৌলুস আর নেই। এখন আর বাজে না আগের মত স্টিমারের ভেপু। বন্ধ হয়ে গেছে পাটকলগুলো। মেইল ট্রেনগুলি এখন আর নারায়ণগঞ্জ থেকে ছাড়ে না। রেল স্টেশনের প্লাটর্ফমগুলি সন্ধ্যার পর পতিতাদের দখলে চলে যায়। শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলি রাতের বেলায় বাস মালিকদের দখলে চলে যায়। কোন মুমূর্ষ রোগী নিয়ে এসময় চলাচল করা যায় না। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ দিন দিন ঘিঞ্জি শহরে পরিণত হচ্ছে। এককথায় নারায়ণগঞ্জ যেনো আলোর নিচে এক অন্ধকার শহর । শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন যানজট। শহরের কেন্দ্রস্থল এক নং রেল গেট এলাকায় বাসটার্মিনাল হওয়ায় এটি যানজট সমস্যা তৈরি করছে। শহরের মধ্য দিয়ে বাসের যাওয়া-আসাও যানজটের অন্যতম কারণ। তাই বাসস্ট্যান্ড শহরের বাইরে স্থানান্তর প্রয়োজন। চাষাড়া রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের পুকুরটি বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের জন্য সিটি করপোরেশনকে দেওয়া প্রয়োজন।