জ্ঞানী-গুণী ও সাধকদের স্মৃতিধন্য সোনারগাঁও

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৩, ২১:২৪
কানিংহ্যাম মন্তব্য করেন যে, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে সোনারগাঁও ছিল একটি স্বাধীন রাজ্যের রাজধানী। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে সম্ভবতঃ ভারতের যে কোন নগরীর চাইতে অধিকতর ব্যাপকহারে এ নগরীতে পীর-দরবেশ ও ফকির আউলিয়াদের সমাগম হয়। আধুনিক সোনারগাঁওয়ের বন-জঙ্গল ও পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পীর-ফকিরদের কমপক্ষে ১৫০টি গদ্দী (মাজার ও চিরিয়াখানা) খুঁজে পাওয়া যাবে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে সোনারগাঁও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির একটি যথার্থ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠে। ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা ও মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল হিসাবে সোনারগাঁওয়ের সুখ্যাতির মূলে ছিল শেখ শারাফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্ নামে খুবই ধর্মপ্রাণ একজন সাধকের অবদান। তিনি সুলতান বলবনের রাজত্বে (১২৬৬-১২৮৭) দিল্লী থেকে সোনারগাঁও হিজরত করেন। শেখ শারাফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্ সোনারগাঁওয়ে একটি ইসলামী একাডেমী এবং খানকার ভিক্তি স্থাপন করে। এম,এ রহিমের ভাষায় “শেখ শারাফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ্ ছিলেন সোনারগাঁও ও পূর্ববাংলার মহান গৌরবের প্রকৃত কর্ণধার”। তার পান্ডিত্য ও আধ্যাত্মিক সাফল্য বহু সাধক ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে সোনারগাঁওয়ে আকৃষ্ট করেছিল। এদের মধ্যে অন্যতম মাখদুম মাওলানা শারফুদ্দীন ইয়াহইয়া মানেরী। একথা সত্য যে, আবু তাওয়ামার বিখ্যাত ইয়াহইয়া মানেরী তাঁর শিক্ষকের সাথে সোনারগাঁও এসেছিলেন। ১৩০০খৃঃ আবু তাওয়ামাহর মৃত্যু হয় এবং তাঁকে সোনারগাঁওয়ে সমাহিত করা হয়। সমগ্র সোনারগাঁও অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পরিত্যক্ত এককালের বিখ্যাত নগরীর সুখকর অতীতের স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যাবে। এসব বিরান ভূমি খুবই উঁচু মানের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসাবে এক সময় ছিল উপ-মহাদেশের গর্বস্বরূপ। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসেবে সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্য চতুর্দশ শতাব্দীতেও খুবই জাজ্বল্যমান ছিল, বিশেষভাবে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ্র আমলে। তিনি ছিলেন সাধক ও জ্ঞানীদের একান্ত ভক্ত। তিনি শেখ নূর কুতুব আলমের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আজম শাহ্ সোনারগাঁওয়ের এক জাঁকজমকপূর্ণ দরবারের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এখানকার মোগড়াপাড়া এলাকাতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। সাধক ও ধর্ম প্রচারকদের স্মৃতিচিহ্নবাহী ভগ্ন ইমারত থেকে প্রমাণিত হয় যে, সোনারগাঁও ইসলামের একনিষ্ঠ সাধকদের মহান আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের গুণী পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ এ স্থানে তাদের নিবাস ও কর্মস্থান গড়ে তোলেন। তাঁদের মধ্যে যে কয়েকজনের নাম জানা যায়, তন্মধ্যে অন্যতম শেখ আলাউদ্দিন হক। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে সুলতান সিকান্দার শাহ্র রাজত্বকালে হযরত পান্ডুয়া থেকে সোনারগাঁও আসেন। তিনি দুই বছর সোনারগাঁওয়ে অবস্থান করেন। বলপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী হিন্দু রাজা গণেশের বংশ (১৪১৪-১৪৫২খৃ:) সুফী দরবেশদের হত্যা ও নির্বাসনের মধ্য দিয়ে বাংলা থেকে ইসলামের সকল চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে। দনুজমর্দন দেব বদর আল ইসলামকে হত্যা করে এবং বিখ্যাত সাধক নূর কুতব আলমের পুত্র ও দৌহিত্র শেখ আনোয়ার ও শেখ জাহিদকে হযরত পান্ডুয়া থেকে সোনারগাঁওয়ে বিতাড়িত করেন। পরবর্তীকালে হিন্দু রাজার নির্দেশে শেখ আনোয়ারকে হত্যা করা হয় এবং তাকে সোনারগাঁওয়ে সমাহিত করা হয়। এম, এ, রহিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায় এই বিখ্যাত সাধক ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই জ্ঞন-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি সোনারগাঁওয়ের ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান চর্চাকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। সুলতান হোসেন শাহের রাজত্বকালে শিল্পকলা ও সংস্কৃতির সর্বাধিক উত্কর্ষ সাধিত হয়।